অর্থনীতিতে স্বর্ণালী অধ্যায় সৃষ্টি করেছে মৎস্য খাত

অর্থনীতিতে স্বর্ণালী অধ্যায় সৃষ্টি করেছে মৎস্য খাত
মৎস্য খাত-দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

তাসফিয়া তাবাসসুম । বুধবার, ২৫ মে ২০২২ । আপডেট ১০:২০

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বিশাল জলসম্পদে সমৃদ্ধ। দেশজুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল। হাওড়-বাঁওড় ও পুকুর। দক্ষিণে অন্তহীন সমুদ্র বঙ্গোপসাগর। মৎস্য উৎপাদনের সুবিস্তৃত ক্ষেত্র পড়ে আছে দেশের সর্বত্র। রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ। এসব সুস্বাদু ও সহজপাচ্য মাছ তাই বাঙালীদের কাছে অতি প্রিয়। মাছ আর ভাত ছাড়া বাঙালির খাবার মনপূত হয় না। বাঙালীর খাদ্যে মাছ এবং ভাতেরই প্রাধান্য। অনাদিকাল থেকে মাছ এবং ভাতের ওপর বাঙালীদের নির্ভরতার কারণে এ দেশের মানুষের পরিচয় হয়েছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি।’ জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

মৎস্য চাষের সঙ্গে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঙালির সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে মাছ। দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান অনস্বীকার্য। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ মৎস্য খাতের অবদান। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ ভাগ আসে মাছ থেকে। দেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ গড়ে জনপ্রতি প্রতিদিন ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মাছ গ্রহণ করছে।

স্বাদু পানির উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। দেশে উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশ এখন বাজারজাত করছেন মৎস্য চাষিরা। এ ছাড়া কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৩০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছ। দেশীয় মাছ সংরক্ষণে ময়মনসিংহে ‘লাইভজিন’ ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে দেশীয় মাছ আবার ফিরে এসেছে ভোজনরসিক বাঙালির পাতে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্মুক্ত করা হয়েছে নতুন উদ্ভাবিত চতুর্থ প্রজন্মের অধিক উৎপাদনশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল ‘সুবর্ণ রুই’। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। বাংলাদেশের ইলিশ ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ বা ‘জিআই’ সনদ পেয়ে নিজস্ব পরিচয়ে বিশ্ববাজারে স্বমহিমায় হাজির হয়েছে। ইলিশ সম্পদ রক্ষা ও ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে সরকার নানামুখী সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ফলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান, মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে মাছের গুরুত্ব, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও মাছ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জনগণকে আরো সম্পৃক্ত ও সচেতন করা হচ্ছে।

কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ২০০৮ সালে মৎস্য উপ-খাতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জিত নির্দিষ্ট আটটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার প্রণীত দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য উপখাতকে অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে মৎস্য উপখাতের বিশেষ করে মাছ চাষ সম্প্রারণ ও মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য সম্পদের জৈবিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্যবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে বেকারের সংখ্যা ২০২১ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৫ কোটিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বর্তমান দারিদ্র্যসীমাকে ২০ শতাংশ ও চরম দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে মৎস্য উপ-খাত বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচনে মৎস্য চাষ সূচনা করতে পারে এক সম্ভাবনাময় সোনালি অধ্যায়।

লক্ষ্য করা প্রয়োজন, মৎস্য চাষের মধ্য দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং রপ্তানি আয়ের উপরোক্ত পুরো আলোচনাটিই মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদণ্ডসংক্রান্ত। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মৎস্য সম্পদের আলোচনা এখানে নেই। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পৃথিবীর সব মানুষের মোট আমিষ চাহিদার শতকরা ১৫ ভাগ আসে সামুদ্রিক সম্পদ থেকে। সম্প্রতি সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদকে কাজে লাগানোর বিরাট সুযোগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে শামুক, সেলফিশ, কাঁকড়া, হাঙর, অক্টোপাস এবং অন্যান্য প্রাণী ছাড়াও শুধু মাছেরই ৫০০ প্রজাতি বিদ্যমান বঙ্গোপসাগরে। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরের সহজলভ্য মোট আট মিলিয়ন টন মাছের মধ্যে আহরণ করা হয় মাত্র শূন্য দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ। অন্য দিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুনীল অর্থনীতির ২৬টি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে মৎস্য সম্পদ আহরণ অন্যতম। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির জনক মৎস্য সম্পদের বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ হয়ে উঠার যে সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, সেটা সত্যে পরিণত হতে পারে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading