উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ

উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ

শাকিবুল হাসান । বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং মানুষের খাদ্য ব্যবহারের অধিকারকে বোঝায়। কোনো বাসাকে তখনই খাদ্য নিরাপদ বলে মনে করা হয়, যখন এর বাসিন্দারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না কিংবা খাদ্যাভাবে উপবাসের কোনো আশঙ্কা করেন না। এক সময় ছিল দেশে খাদ্যের অভাব। তখন দাবি ছিল, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। খাদ্য ঘাটতি কমে গেল। এলো পুষ্টিকর খাদ্যের ধারণা, পরে সুষম খাদ্য। আমরা খাদ্যে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য নিয়ে নতুন ধারণার সূচনা হলো। তা হলো- নিরাপদ খাদ্য। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সরকার খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে।

নিরাপদ খাদ্য ধারণা শুধু খাদ্যবাহিত রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এ ধারণা আরও ব্যাপক হয়েছে। খাদ্য নিরাপদ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে না, বরং আরও দীর্ঘমেয়াদি রোগের সৃষ্টি করে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অসংক্রামক রোগ। যেমন- ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, ক্যান্সার ইত্যাদি। যা এখন বাংলাদেশে প্রায় মহামারী রূপে দেখা দিয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুদ নিরাপদ না হলে যে কোনো মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ৬১ শতাংশ কারণ অসংক্রামক রোগ। কিন্তু অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এ রোগ জীবনযাপনের ধরন, তামাক সেবন এবং খাদ্যের অভ্যাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। করোনাভাইরাসে তরুণদের চেয়ে প্রবীণদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, করোনায় মৃতদের বড় একটা অংশ প্রবীণ। ৪০ বছরের পর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। জীবাণুর স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী করোনাভাইরাস তাদেরই সহজে কাবু করে। প্রবীণদের ‘ইম্যুনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। প্রায় প্রত্যেকেই হার্টের সমস্যা, ফুসফুসের অসুখ, ডায়াবেটিস বা কিডনি ইত্যাদি অসংক্রামক রোগে ভোগেন। দেশে এসব রোগ বিস্তৃতিতে খাদ্যে ভেজাল প্রধানতম কারণ। দেশের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনে বড় অর্জন আনতে গিয়ে বেড়েছে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। মাটির ওপর নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে; কিন্তু খাদ্যের গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে। প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দূষিত খাবারের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে- ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতিবছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। আর অসুস্থ হয় ১৫ কোটি মানুষ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর তিনজনই ডায়রিয়ায় ভোগে। রোগটি এ অঞ্চলের শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার দূষিত হয়। সেই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হিসেবে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিভিন্ন অসুখ হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, বিভিন্ন উৎসবে বা দুর্যোগে খাদ্যের ওপর লভ্যাংশ কমিয়ে ভোক্তাদের জন্য খাদ্য সহজলভ্যতা করা হয়। আর খাদ্যে ভেজাল কি তারা বোঝেন না! আমরা ঠিক উল্টো। বিভিন্ন ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানের সময় ও দুর্যোগকালীন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করি। শুধু লাভের হিসাবটাই করেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়া এবং সুশীল সমাজকে এক্ষেত্রে নেতৃত্ব স্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের বিবেকটা জাগ্রত করতে হবে, মানবিক বোধ জাগ্রত করতে হবে। সর্বোপরি আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading