শাহরুখপুত্র আরিয়ান খানের মাদক মামলা: ইন্ডিয়ান ‘রাজনীতি’র ঘোরপ্যাঁচ

শাহরুখপুত্র আরিয়ান খানের মাদক মামলা: ইন্ডিয়ান ‘রাজনীতি’র ঘোরপ্যাঁচ

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৯ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৫০

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে মাদক মামলা ও তার জেলে যাওয়ার ঘটনা শুধু ইন্ডিয়াতেই নয় গোটা বিশ্বেই ছিলো আলোচনার তুঙ্গে। সেই আলোচনা এবার মোড় নিলো ভিন্ন পথে। ইন্ডিয়ার বিশেষ তদন্তকারী সংস্থার মতে আরিয়ান খানের গ্রেপ্তানের পেছনে ছিলো একাধিক ‘আইনি ফাঁক’। তাতে প্রশ্ন উঠেছে তবে কী ইচ্ছে করেই ফাঁসানো হয়েছে শাহরুখ পুত্রকে। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত

শাহরুখ-পুত্র আরিয়ান খান মাদক মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরই তার জেলে যাওয়া এবং পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। সমালোচনার তীর তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকেই। গত শুক্রবার ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এনসিবি) জানিয়েছিল, আরিয়ানের বিরুদ্ধে মাদকের কোনও তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় নি। দীর্ঘ টালবাহানার পর শুক্রবারই শাহরুখ-তনয়কে বেকসুর খালাস করে এনসিবি। আর এরপরেই শাহরুখ ভক্তরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা শুরু করতে থাকে। ইন্ডিয়ার আইন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, শুধু ইন্ডিয়াই নয় শাহরুখ খান গোটা বিশ্বেরই সেরা তারকাদের একজন। সেখানে তার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ কেমন টালবাহানা। এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা নিয়ে সরব হল বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। গত বছর এনসিবি যে ভাবে আরিয়ান খান-সহ ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছিল, তাতে একাধিক ‘আইনি ফাঁক’ রয়েছে বলেই মনে করছেন সিট সদস্যরা। তাদের প্রশ্ন, ইচ্ছা করে মাদক-কান্ডে ফাঁসানো হয়নি তো আরিয়ানকে?

নবাব মালিক

প্রশ্ন জাগাচ্ছে তদন্তের গড়মিল
সিটের বক্তব্য, তদন্তে প্রথম যে ফাঁক ধরা পড়ছে সেটি হল, বাধ্যতামূলক শারীরিক পরীক্ষা না করানোর সিদ্ধান্ত। প্রমোদতরীতে অভিযান চালিয়ে আরিয়ান এবং তার বন্ধুদের যখন তুলে নিয়ে যাওয়া হল, তাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হল না কেন? তারা মাদক সেবন করে থাকলে সেখানেই তো ধরা পড়ত। বিশেষ তদন্তকারী সংস্থার প্রশ্ন, ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর আরিয়ানের প্রমোদতরীতে অভিযান চালানোর কোনও ভিডিও রেকর্ড করা হয়নি কেন? সিট সে নিয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রহস্যের গন্ধ কি এনসিবির তদন্তেও নেই? আনুষঙ্গিক অনেক অভিযোগের পিছনেও যথেষ্ট প্রমাণের অভাব রয়েছে বলেই মনে করছে সিট।

আরিয়ানকে গ্রেপ্তারের পর সর্বপ্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির নেতা নবাব মালিক। আরিয়ানের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তার দাবি, বিজেপি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (এনসিবি)-এর যোগসাজশের জেরেই শাহরুখপুত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। মহারাষ্ট্র সরকার ও বলিউডের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এই চক্রান্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন কংগ্রেস নেতারা। কংগ্রেস নেতা শচীন সাওয়ান্তও আরিয়ানের গ্রেপ্তারের ঘটনায় এনসিবি’র বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি বলেছেন, মাদক বাজেয়াপ্ত ও অভিযানে উপস্থিত দুই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে এনসিবি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে গরমিল রয়েছে। আর এর থেকেই স্পষ্ট আরিয়ানের গ্রেপ্তারের নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও অভিসন্ধি।

শাস্তির মুখে এনসিবি’র সেই সমীর ওয়াংখেড়
এদিকে চার্জশিট পেশ হতেই নড়েচড়ে বসেছে ইন্ডিয়ান সরকার। এনসিবি-র প্রাক্তন কর্মকর্তা সমীর ওয়াংখেড়ের বিরুদ্ধে এবার কড়া ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছে। ২০২১ সালের ২ অক্টোবরে মুম্বাইয়ের উপকূলে প্রমোদতরী কর্ডেলিয়ায় এনসিবি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সমীরই। সেখান থেকে মাদক পাওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল আরিয়ান ও তার সঙ্গীদের। প্রায় এক মাস জেলে কাটিয়ে জামিনে ছাড়া পান বলিউড বাদশা’র ছেলে। তার পরেও নিয়মিত এনসিবি দফতরের জিজ্ঞাসাবাদে হাজিরা দিতে হত আরিয়ানকে। তার পরে গত শুক্রবার পেশ করা চার্জশিটে এনসিবি জানিয়েছে, আরিয়ানকে বেকসুর খালাস করা হল। প্রাথমিক ভাবে ওই মাদককাøে জিজ্ঞাসাবাদসহ তদন্তের ভার ছিল এনসিবি মুম্বাই শাখার উপরে। তার নেতৃত্বে ছিলেন সমীরই। পরে ওই তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকায় তদন্তভার চলে যায় কেন্দ্র-নিযুক্ত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)-এর হাতে। ভুয়া তদন্ত, তদন্তে প্রভাব খাটানোসহ একাধিক অভিযোগে পদ থেকে সরতে হয়েছিল সমীরকে। এবার আরিয়ানকে চার্জশিটে নির্দোষ ঘোষণার পরে শাস্তির মুখে এসে দাঁড়ালেন ওই প্রাক্তন এনসিবি কর্মকর্তা।

আরিয়ানই বলেছিলেন জাহাজে মাদক ‘না আনতে’
আরিয়ান খান বেকসুর খালাস পেলেও, চার্জশিট পেশ করা হয়েছে শাহরুখের ছেলের বন্ধু আরবাজ মার্চেন্টের নামে। আরবাজ দাবি করেছে, তাকে মাদক আনতে ‘না’ করেছিলেন আরিয়ান। এই মামলার অভিযুক্ত আরবাজ মার্চেন্টের উপর এখনও রয়েছে খাঁড়া। ক্রুজে চল্লাশি চালানোর সময় আরবাজের কাছ থেকে মাদক পাওয়া যায়। সেই সময় এনসিবি দাবি জানিয়েছিলেন, পার্টিতে আরবাজ মাদক এনেছিলেন আরিয়ানের জন্য। তবে, সবশেষে জানা যায় আরবাজ নিজেই নাকি জানিয়েছেন এনসিবি-কে, মাদক আনতে ‘না করেছিল’ আরিয়ান। এনসিবির ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল সঞ্জয় কুমার সিং গণমাধ্যমকে জানান, আরবাজ যে পার্টিতে আরিয়ানের জন্য মাদক এনেছিল সে তথ্য ‘ভুল’। তার কথায়, ‘ও (আরবাজ মার্চেন্ট) নিজেই জানিয়েছে পার্টিতে আরিয়ানের জন্য মাদক নিয়ে যায়নি। এমনকী, ও তো সিটকে জানিয়েছে আরিয়ান বলেছিল ক্রুজে যেন কোনও মাদক আনা না হয়। কারণ এনসিবি খুব সজাগ।

বাবা শাহরুখ খানের সঙ্গে ছেলে আরিয়ান

আরিয়ানের গ্রেপ্তার ও রাজনীতির গন্ধ
মাদক কান্ডে ছেলের জেল হওয়ায় নিজেকে ঘরেই বন্দি করে ফেলেছিলেন বলিউড বাদশা শাহরুখ খান। নিজের জন্মদিনেও বাড়ির বারান্দা থেকে অনুরাগীদের দেখা দেননি বলিউড বাদশা। বাবার মতো অভিনয়ে নয়, বরং সিনেমা পরিচালনা করতে চান আরিয়ান খান। বাবা শাহরুখ খানও ছেলের এই ইচ্ছাকে সমর্থন জানিয়েছেন। শাহরখ তনয়ের গ্রেপ্তার যদি পরিকল্পিতই হয় সেক্ষেত্রে এখানে ভিন্ন কোনো ফন্দিও লুকিয়ে থাকতে পরে বলে অভিযোগ শাহরুখ ভক্তদের।

যে পাঁচ কারনে নির্দোষ আরিয়ান
পাঁচটি জিনিসের উপর ভিত্তি করে আরিয়ানকে নির্দোষ ঘোষণা করে এনসিবি। এনসিবি-র তরফে বলা হয়েছে, আরিয়ানের বিরুদ্ধে কোনও সন্দেহের যুক্তিসঙ্গত অবকাশই নেই। এমনকী আরিয়ানের কাছে কোনও মাদক পাওয়া যায়নি বলেও জানানো হয়েছে। এনসিবি-র তরফে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ তদন্তকারী দল নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে তদন্ত করেছে। বিশেষ তদন্তকারী দলের তদন্তের ভিত্তিতে, এনডিপিএস (নার্কোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস) আইনের বিভিন্ন ধারায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ (চার্জশিট) দায়ের করা হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে বাকি ছ’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে না।’ এই ৬ জনের মধ্যেই রয়েছেন আরিয়ান।

সংস্থার তরফে বলা হয়েছে, ২ অক্টোবর যখন অভিযান চালানো হয়, আরিয়ান খান, ইশমিত, আরবাজ, বিক্রান্ত এবং গোমিতকে আন্তর্জাতিক পোর্ট টার্মিনালে এবং নুপুর, মোহাক এবং মুনমুন ধামেচাকে প্রমোদতরীতে আটক করা হয়, তখন আরিয়ান খান এবং মোহক ছাড়া সকলের কাছে মাদক পাওয়া যায়। এটিও আরিয়ানের মুক্তির অন্যতম কারণ। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে এমন কোনও প্রমাণ নেই, যা থেকে বোঝা যায়, আরিয়ান খান মাদক চক্র বা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেটের অংশ। এটি আরিয়ানের মুক্তির পিছনে অন্যতম কারণ। সঞ্জয় কুমার সিংয়ের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) পুরো মামলাটি পুনরায় তদন্ত করছিল এবং দেখা গিয়েছিল যে আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এসআইটি ৬ নভেম্বর মামলাটির দায়িত্ব নেয়। তাদের তদন্তে দেখা গিয়েছে, আরিয়ান খান কখনও মাদকসেবন করেননি। তিনি যে আন্তর্জাতিক মাদকপাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত নন, সেটিও প্রমাণ করে তার ফোনে পাওয়া চ্যাটগুলি। মুম্বাই হাইকোর্ট গত বছরের ২৮ অক্টোবর আরিয়ানকে জামিন দেয়। তখন বলা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে কোনও মাদকপাচার সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত থাকার মতো তেমন প্রমাণ নেই। এই মামলা থেকে আরিয়ানের নিষ্কৃতি পাওয়ার অন্যতম কারণও এটি।

হাই-প্রোফাইল মামলাটি নিয়ে এনসিবি’ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। একজন প্রধান সাক্ষী অভিযোগ করেন, এজেন্সির মুম্বাই জোনের প্রধান সমীর ওয়াংখেড়ে ২৫ কোটি টাকা জোর করে আদায় করার চেষ্টা করছেন আরিয়ানকে কাজে লাগিয়ে। সাক্ষী আরও অভিযোগ করেন, তাঁকেও জোর করে সাদা কাগজে সই করানো হয়েছে। এর পরেই এনসিবির পক্ষে মামলাটি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৯ মে ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২ অক্টোবর এনসিবি কোর্ডেলিয়া প্রমোদতরীতে অভিযান চালিয়ে শাহরুখ পুত্রসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন এনসিবি তাদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করে। অক্টোবরের ২৮ তারিখ আরিয়ান খান, আরবাজ মার্চেন্ট ও মুনমুন ধামেচাকে জামিন দেয় হাইকোর্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading