আমেরিকার স্কুলে একের পর এক অস্ত্রবাজি-হত্যাকাণ্ড: অস্ত্র-ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৮ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
আমেরিকার বিভিন্ন স্কুলে সশস্ত্র হামলার ঘটনা এখন মহামারীর চেহারা পেয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত দেশটির স্কুলগুলোতে ১৩৭টি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকাতে মানুষের চেয়ে বন্দুক বেশি। তার পরও দেশটিতে বন্দুক বিক্রি বৃদ্ধি পায়। আলোচনা, বিক্ষোভ, সমাবেশের পরেও কেন কঠোর আইনে আসছে না অস্ত্র বিক্রি? অস্ত্র বিক্রির নেপথ্যের শক্তি কারা? বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক।
আমেরিকায় বন্দুক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ শতাংশ মারা গেছে গণগুলিবর্ষণের ঘটনায়। এর মানে ছোটখাটো ঘটনাই প্রচুর ঘটছে এবং বর্ণগত সুবিধাবঞ্চিত এলাকায়ই বেশি ঘটছে। গত মঙ্গলবারের বিয়োগান্ত ঘটনার মতো বড় ধরনের কিছু না হলে সাধারণত এসব ঘটনার আড়ালে পড়ে থাকে, এমনকি নিহতরা স্কুলবয়সী হলেও। আমেরিকা এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষের চেয়ে বন্দুক বেশি। তার পরও দেশটিতে বন্দুক বিক্রি বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এই সময়ে সেখানে হত্যাকাণ্ডের হার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আর আগ্নেয়াস্ত্র হয়ে উঠেছে আমেরিকার শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। গত বছর দেশটির অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সী দেড় হাজার শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে বন্দুক।
বাইডেনের ক্ষোভ
ইউভালডির ঘটনার পর গত মঙ্গলবার জো বাইডেন প্রশ্ন করেছেন, আমেরিকা কেন এই হত্যাযজ্ঞ নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। এই প্রশ্ন করার কারণ হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোরভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। অথচ গণগুলিবর্ষণের পর আগ্নেয়াস্ত্র আইনের পক্ষে সমর্থন ঠিকই বৃদ্ধি পায়।
রিপাবলিকান নেতাদের হস্তক্ষেপ
টেক্সাসের রিপাবলিকান নেতারা বন্দুক রাখার অধিকার সম্প্রসারণের জন্য নিজেরা গর্ব অনুভব করেন। রিপাবলিকান নেতা রাজ্য গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, রাজ্য সিনেটর টেড ক্রুজ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহান্তে হিউস্টনে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের (এনআরএ) সভায় বক্তব্য দেবেন বলে কথা রয়েছে। বন্দুক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ এবং আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগকে ডান দিকে সরিয়ে দেওয়াও আরেকটি সমস্যা। একটি রক্ষণশীল ও বন্দুকের পক্ষে থাকা আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট শিগগির জনসমক্ষে কারা বন্দুক বহন করতে পারবে তা নিয়ে নিউ ইয়র্কের একটি আইনের ওপর রায় দেবেন। রায়টি সম্ভবত অন্যান্য ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধগুলোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। (দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)
বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা
বাইডেন প্রশাসনের স্থানীয় বন্দুক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি কাজে লাগছে। এতে প্রচুর পরিমাণে তহবিল জোগানোর বিষয়ে বাইডেন প্রশাসনের অবস্থান শুধু সঠিকই নয়, বরং এ ব্যাপার আরো বেশি কিছু করা উচিত। একই সঙ্গে নারীবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ বেশির ভাগ গণগুলিবর্ষণকারীর নারীর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ এবং পরিবারের নারী সদস্যদের আক্রমণ করার ইতিহাস রয়েছে। এমনকি এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর আগে অনেক নারী তাদের সঙ্গীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সহিংসতা থেকে রক্ষা পাওয়া ব্যক্তি এবং শোকাহত পরিবারগুলোর অবিরাম প্রচার মিশনও একটি জাতিকে পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়, তখন আশাবাদী হওয়া খুব কঠিন। তাই ইউভালডির মতো ঘটনা থেকে শিশুদের কিভাবে বাঁচানো যায় এটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়, বরং আরো ব্যাপক আকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ লোকদের রক্ষা করার জন্য কী করা উচিত সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটা ঠিক যে এই মৃত্যুগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বসহকারে বন্দুক সহিংসতার সমাধান করতে বাধ্য করবে না। তাই এসব মৃত্যু অকল্পনীয় বলার সুযোগ নেই এবং নিষ্ক্রিয়তাই এ জন্য দায়ী।
কানাডায় স্কুলের সামনে বন্দুকধারীকে গুলি
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টোতে স্কুলের সামনে এক বন্দুকধারী ব্যক্তিকে হত্যা করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেলের দিয়ে ঘটেছে এ ঘটনা। বুধবার আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে একটি প্রাথমিক স্কুলে বন্দুক হামলার পরের দিনই প্রতিবেশী দেশ কানাডায় ঘটল এমন ঘটনা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে টরন্টো পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে টরন্টোর উইলিয়াম জি ডেভিস জুনিয়র পাবলিক স্কুলের সামনের সড়কে আসে ২০ বছর বয়সী এক যুবক। সেখানে পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার পর পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। পুলিশ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। উল্লেখ্য, যে সড়কে ওই বন্দুকধারীকে হত্যা করা হয়, সেখান থেকে উইলিয়াম জি ডেভিস জুনিয়র স্কুলের দূরত্ব মাত্র ১৩০ মিটার। এছাড়া ওই সড়কে আরও ৫টি স্কুল রয়েছে।
অসহিষ্ণুতা বাড়ছে আমেরিকায়
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, আমেরিকায় রাজনৈতিক বিভাজন মানুষকে অসহিষ্ণু করে তুলছে। মার্কিনি গণতন্ত্রের যে সুনাম ছিল, তাতে চিড় ধরেছে। এখন পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদির জায়গায় ক্ষমতায় টিকে থাকার সর্পিল পথকেই অনেক বেশি আপন করে নিয়েছে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। সমাজের অভ্যন্তরে যে দ্বান্দ্বিক বিভাজনের প্রবণতা বেড়ে চলেছে, সেটা দেশটির যেকোনো স্তরের নাগরিককে প্রভাবিত করে চলেছে। এই তো কিছুদিন আগে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে সাবওয়ের ভেতরে বাংলাদেশের এক তরুণী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সেটাও একধরনের অসহিষ্ণুতার ফল হতে পারে। অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে মার্কিনদের মধ্যে মাথাব্যথাও বাড়ছে।

আগ্নেয়াস্ত্র বিস্তারের নেপথ্যে এনআরএ
আমেরিকার নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানা ও বহনের অধিকারের পক্ষে প্রভাবশালী যে সংগঠনটি সবচেয়ে বেশি ওকালতি করে যাচ্ছে, তার নাম এনআরএ। এনআরএ হচ্ছে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের সংক্ষিপ্ত রূপ। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের দুই সাবেক যোদ্ধা ১৮৭১ সালে শৌখিন শুটারদের এই সংগঠন গড়ে তোলেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে রাইফেলের গুলি ছোড়ার কৌশল শেখানো হত এই ক্লাবে। এনআরএ রাজনৈতিক অঙ্গনে তদবিরের পথে হাঁটতে শুরু করে ১৯৩৪ সালে। কিন্তু ১৯৭০ এর দশকে জিসিএ কার্যকরের পর থেকে এ সমিতি আরও বেশি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আইনপ্রণেতাদের তহবিল যোগান দিতে ১৯৭৭ সালে নিজেদের পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) গড়ে তোলে এনআরএ। বর্তমানে আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী লবি গোষ্ঠীগুলোর একটি এই এনআরএ। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের প্রভাবিত করার জন্য তাদের বিপুল বাজেট রয়েছে। এই লবি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন এনআরএ এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েইন লাপিয়ের। এই লবি গোষ্ঠীকে ভেঙে দিতে নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কৌঁসুলিরা। তাদের অভিযোগ, সমিতির শীর্ষ নেতৃত্ব দাতব্য তহবিলের অপব্যবহার করেছে, তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবন যাপনে ব্যয় করেছে।
বন্দুক বহন বাড়াতে চায় এনআরএ
সব ধরনের বন্দুক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে তদবির করে এনআরএ এবং তারা দাবি করে, আরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র দেশকে আরও নিরাপদ করবে। সমিতির এই অবস্থানের ভিত্তি হচ্ছে আমেরিকার সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর একটি ব্যাখ্যা, যেখানে সরকারি তদারকি ছাড়াই আমেরিকার নাগরিকদেরকে অস্ত্র রাখার অধিকার দেওয়া হয়েছে। স্যান্ডি হুক স্কুলে গোলাগুলির ঘটনায় এনআরএকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট- দুই পক্ষ থেকেই সমালোচনা শুনতে হয়েছিল, ওই সময় সমিতির সভাপতি লাপিয়েরে যুক্তি দিয়েছিলেন, স্কুলে সশস্ত্র রক্ষী না থাকার কারণেই মর্মান্তিক ওই ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় আইনসভায় বন্দুকের মালিকানা সীমিত করার যে কোনো উদ্যোগের নিরবচ্ছিন্ন বিরোধিতা করে আসছে এনআরএ। তারা অপরাধীদের কাছ থেকে পুলিশের জব্দ করা আগ্নেয়াস্ত্র নষ্ট না করে আবার বাজারে বিক্রির পক্ষে তদবির করেছে। তাদের যুক্তি, একটি চমৎকার অস্ত্র নষ্ট করে ফেলা এক ধরনের অপচয়। একইভাবে তারা বন্দুক বহনের অধিকার বাড়ানোর আইনের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে, যেমন ‘ওপেন-ক্যারি’ আইন, যে আইনের অধীনে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক বেশিরভাগ জনসমাগম স্থানে তার আগ্নেঅস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবেন।
আমেরিকার রাজনীতিতে এনআরএ-এর প্রভাব
এনআরএ প্রকাশ্যেই আমেরিকার কংগ্রেস সদস্যদের ‘এ’ থেকে ‘এফ’ শ্রেণিতে বিভক্ত করে থাকে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নীতির পক্ষে রাজনীতিবিদদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই শ্রেণিকরণ করা হয়। নির্বাচনেও এসব রেটিং গুরুতর প্রভাব ফেলে এবং ওই তকমার কারণে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন প্রার্থী নির্বাচনে হেরেও যেতে পারেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এনআরএ তাদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় সদস্যদের মাধ্যমে বড় ধরনের পরোক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে, যাদের অনেকেই কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভোটের হিসাব বদলে দিতে পারে।
এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন- এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচডব্লিউ বুশও রয়েছেন। তিনি ১৯৯৫ সালে সমিতি থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমান সদস্যদের মধ্যে আছেন সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সারাহ পেলিন, অভিনয় শিল্পী টম সেলেক ও হুপি গোল্ডবার্গ।
যেকোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক। হত্যাকাণ্ড আরও বেশি বেদনাদায়ক। শিশুহত্যার বেদনা সহ্য করা কঠিন। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মার্কিন সরকার অথবা তাদের সামাজিক সংগঠনগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, সেটা দেখা দরকার। এছাড়া অস্ত্র নীতিতে আমেরিকাকে আরও কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি এনআরএ-কে এর ভয়াবহতা উপলব্ধির মাধ্যমে নমনীয় আচরণ করতে হবে।
ইউডি/অনিক

