ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষকের হাত ধরে আঙুরে বদলে যাচ্ছে গ্রাম, বিক্রির আশা ১০০ মণ

ঠাকুরগাঁওয়ে কৃষকের হাত ধরে আঙুরে বদলে যাচ্ছে গ্রাম, বিক্রির আশা ১০০ মণ

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০

গ্রামের সরু কাচা পথ। দুই পাশে সবুজের সারি। মাথার ওপর বাশের মাচায় ঝুলছে থোকায় থোকায় আঙুর। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো পর্যটন বাগান। কিন্তু এটা একটি গ্রামের বাড়ির প্রবেশপথ। আর সেই পথই এখন আলোচনায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ঝলঝলি বসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের বাড়ির এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকছেন। অনেকেই আবার অনুপ্রাণিত হয়ে ফিরছেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে।

প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্যোগের শুরু। দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাজ করার সময় সুযোগ পেলেই বিভিন্ন ফলের বাগান ঘুরে দেখতেন আবুল কালাম। তখনই মনে বীজ বুনেছিলেন দেশে ফিরেও এমন কিছু করবেন। দেশে ফিরে প্রথমে সবজি চাষে হাত দেন। পরে ধীরে ধীরে আঙুর চাষে মনোযোগী হন।

শুরুটা ছিল মাত্র ৭০টি গাছ দিয়ে। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২০০। চার বিঘা জমির পাশাপাশি বাড়ির যাতায়াতের পথ ও পুকুরপাড়কেও কাজে লাগিয়েছেন তিনি। মাচা তৈরি করে তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন আঙুরলতা। এখন পুরো জায়গাটাই যেন এক সবুজ ছাউনি। শুধু আঙুরই নয়, এই বাগানে রয়েছে বৈচিত্র্যময় ফলের সমাহার। বেদানা, লটকন, জামরুল, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফল, মাল্টা, আপেল, নাশপাতিসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির গাছ। সঙ্গে আছে চুইঝাল ও গোলমরিচের মতো মসলা জাতীয় উদ্ভিদ। সব মিলিয়ে জায়গাটি এখন একটি ছোট বহুমুখী ফলবাগানে পরিণত হয়েছে।

চাষাবাদের পদ্ধতি সম্পর্কে আবুল কালাম বলেন, ইউটিউব দেখে আঙুর চাষ শিখেছি। লতানো গাছ হওয়ায় উঁচু মাচা তৈরি করেছি। মূলত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়, অন্য কোনো রাসায়নিকের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। ফেব্রুয়ারিতে ডালপালা ছাঁটাই করলে মার্চে ফুল আসে আর জুন-জুলাইয়ের দিকে ফল সংগ্রহ করা যায়।

গাছ রোপণ ও পরিচর্যায় তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। তবে চলতি মৌসুমেই ৯০ থেকে ১০০ মণ আঙুর উৎপাদনের আশা করছেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা হতে পারে। আবুল কালাম বলেন, এ বছরই খরচ উঠে আসবে বলে আশা করছি। অনেকেই আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে চাষ শুরু করেছেন। আমি চাই, দেশে ঘরে ঘরে আঙুরের চাষ হোক বিদেশ থেকে যেন আর আঙুর আমদানি করতে না হয়।

আগামী দেড় মাসের মধ্যেই আঙুরগুলো পরিপক্ব হবে বলে জানান আবুল কালাম। স্বাদে মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও ভালো চাহিদা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।

বাগান দেখতে আসা মাজেদুল, মামুন, নাজমূল ও ইয়াসিন বলেন, গতবার এখানে এসে আঙুর খেয়েছিলাম খুবই মিষ্টি ছিল। আরও বেশি ফলন হয়েছে শুনে আবার এলাম। মাচাজুড়ে এমন আঙুর সত্যিই দেখার মতো।

আরেক দর্শনার্থী রুবেল হোসেন বলেন, ফেসবুকে ছবি দেখে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। এখানে এসে দেখলাম, আমাদের এলাকায়ও এভাবে আঙুর চাষ সম্ভব। আমিও চারা নিয়ে চাষ করার কথা ভাবছি।

পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান আঙুরবাগান পরিদর্শনে যান। তিনি বলেন, আঙুর চাষে দোআশ মাটি, জৈব সারসমৃদ্ধ কাকর মাটি সবচেয়ে উপযোগী। আবুল কালাম দুই বছর ধরে আঙুর চাষ করছেন এবং ভালো ফল পাচ্ছেন। তবে ফল পরিপক্ব না হওয়ায় আঙুরের মিষ্টতা যাচাই করার সুযোগ হয়নি। এবার যাচাই করে দেখা হবে। তার বাগানের আঙুর মিষ্টি হলে, অন্য চাষিদের মধ্যেও আঙুর চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেবো।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আবুল কালামের বাগানে যে আঙুরের ফলন দেখা যাচ্ছে, তা আশাব্যঞ্জক। কৃষি বিভাগ তার পাশে থাকবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading