আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের পার্থক্য বাড়ছে
এসকেন্দার হাওলাদার । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১৬:৪৫
আমরা কোন পথে আছি? সেই পথ কি আমাদের জানা আছে? অনেক প্রশ্ন আমাদের হুতাশ মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের ঘোর কাটছে না কোনোকিছুতে অস্থির একটা সময়ের মধ্যে আমাদের গা সওয়ার হচ্ছে। প্রতিদিন আমরা একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। হাপিত্যেশ লেগে আছে সঙ্কোচ আমাদের গায়ে গায়ে লেগে আছে। শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতি আমাদের চোখের সামনে তার সকরুণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে এ অস্থিরতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তবে, মানুষ বড় ধৈয্যশীল। নাহলে বাজারের আগুনে মানুষ স্ফুলিঙ্গের মতো জেগে ওঠার কথা। সেটা কই হচ্ছে? মানুষ বড় অসহায়। তাদের চোখে অদৃশ্য জল।
টাকার দাম পড়ছে। এর একটা মানে হলো, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। কিছুদিন আগেও একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা নিয়ে বাজারে গেলে যতোটা চাল-ডাল-তেল-মসলা, ফলমূল, মাছ-মাংস কেনা যেতো, এখন তার থেকে কম পরিমাণে কেনা যাচ্ছে। টাকার দাম পড়ে যাওয়ার আর একটা মানে হলো, বিদেশি মুদ্রার বাজারে টাকার নিরিখে আমেরিকান ডলারের দাম বাড়ছে। অর্থাৎ, প্রতিটি ডলার কিনতে এখন বেশি টাকা লাগছে। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি ও প্রবাসী আয় দিয়ে আমদানি দায় মেটানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগপণ্য, জ্বালানি, মূলধনী যন্ত্র ও কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে, সেই সাথে বেড়েছে জ্বালানি তেল। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, কাজেই সব জিনিসেরই দাম বাড়ার কথা। তার ওপর করোনার সময় সারা পৃথিবী জুড়ে যে জোগান-ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিলো, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার বদলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তাকে আরও বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে জোগানে টান পড়ছে। ডলারের দাম বেড়ে গেলে তেলের দাম আরও বেড়ে যায়, যার ফল আরও মূল্যবৃদ্ধি। কিন্তু শুধু টাকা কেনো, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন সব কিছুর নিরিখেই তো ডলারের দাম বাড়ছে। আমেরিকায় মূল্যবৃদ্ধির হার এখন ৮.৩%, যা আমাদের দেশ এবং আরও অনেক দেশের মূল্যবৃদ্ধির হারের থেকে বেশি। সে দেশে ঋণাত্মক প্রকৃত সুদের হার এখন আমাদের দেশ এবং আরও অনেক দেশের থেকে কম।
ভালো ভালো পোশাক পরা মানুষদের এখন টিসিবির লাইনে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত মন্ত্রী এই মন্তব্য করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের কোনো ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন। বোঝাতে চাইলেন টিসিবির লাইনে দাঁড়ানোটা শুধু দরিদ্র মানুষ ও ছেঁড়া কাপড় পরাদের কাজ নয়, ভদ্রলোকেরাও দাঁড়াতে পারেন। জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ফরেন রিজার্ভ বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, এবং আধুনিক হিসেবে মাথাপিছু আয় গণনা করার বিষয়গুলো সম্পর্কে শুনি, কিন্তু সব বুঝতে পারি না। হজম করতে পারি না। কিভাবে যেনো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। ইদানিং এই আলাপ চলছে, আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অথচ আমি বুঝতে পারছি না এর মধ্যে কী আনন্দ আছে। হয়তো অনেকে আমার মতোই এরকম নাদান। বরং বুঝতে অসুবিধা হয় না, সংসারে খরচের হিসাবটা কীভাবে বাড়ছে। বাজারে জিনিসের মাত্রা ছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, তেল, গ্যাস, পানির দাম বেড়ে যাওয়ার হিসাব পত্রিকা পড়ে বা অর্থনীতিবিদ বা মন্ত্রীদের কথা শুনে বুঝতে হয় না। স্রেফ নিজের ব্যাগে হাত দিলেই বোঝা যায়। আমাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের পার্থক্য বাড়ছে তো বাড়ছেই। অন্যদিকে বাড়ছে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য।
অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বৈষম্য মাত্রা ছাড়া হয়ে উঠেছে। কারণ বাংলাদেশেই ২০২০ সালে এতো বেশি অতি ধনী মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশে ঘটেনি। দুর্নীতি থেকে আয় হলেও মানুষ যেন লজ্জা না পায় সেজন্য আছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ। আর তাই সাধারণ মানুষ টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রান হয়ে গেলেও বা লজ্জায় মুখ ঢাকলেও সরকার খুশি। কারণ, মাথাপিছু আয় বেড়েই চলেছে। এই বাড়তি টাকাটা মানুষের হাতে তাহলে কোথা থেকে আসবে? চাইলেই বেতন বাড়বে না। তাহলে কি আমরা দুর্নীতি করে আয় বাড়াবো? সংসার খরচ কমাতে গিয়ে প্রতিদিনের খাবার খরচ, সন্তানের জন্য খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের খরচ, চিকিৎসা খরচ, বিনোদন খরচ কোনটা কমাবো? এ এক অন্তহীন প্রশ্ন।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

