বন্যার বিস্তার: দুঃখগাথা ছাপিয়ে জয় হোক মানবতার

বন্যার বিস্তার: দুঃখগাথা ছাপিয়ে জয় হোক মানবতার

অনজন কুমার রায় । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২২ । আপডেট ১৮:৪০

চলতি মৌসুমে মে মাসে প্রথমবারের মতো সিলেটে বন্যা হয়। প্রথম দফা বন্যার রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও বন্যা। সীমাহীন দুর্ভোগের মাঝে আরও আতঙ্ক। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বন্যা হচ্ছে। প্রথম দফার বন্যায় সুনামগঞ্জের হাওড়ের অনেক জায়গাজুড়ে বোরো ধান তলিয়ে যায়। ফলে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দ্বিতীয় দফা বন্যায় মৎস্যজীবীদের অনেক ক্ষতি হয়। বন্যার পানিতে পুকুর, নদী, খাল-বিল একাকার হয়ে গিয়েছিল। এতে চাষ করা মাছ উৎসস্থল থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

বর্তমানে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা বন্ধ রয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কোনো স্থানে কোমর সমান পানি। তাই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অচল হয়ে গেছে সামগ্রিক জীবনযাত্রা। বন্যা হলেই পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পয়ঃনিষ্কাশন ও বন্যার পানি একাকার হয়ে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ে। বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়। এতে আমাশয়, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও জণ্ডিসের মতো রোগবালাই দেখা দেয়। ঠান্ডাজনিত এবং মশা-মাছির উপদ্রবে ডেঙ্গি জ্বর বেড়ে যায়। একদিকে বন্যা, অন্যদিকে অসুখ-বিসুখ। সব মিলিয়ে বন্যাকবলিত মানুষজন দুর্দশায় জীবন পার করছে। অবশ্য বন্যাউপদ্রুত এসব এলাকায় এরই মধ্যে ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়েছে। তবে তা যেন চলমান থাকে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

সমাজের প্রান্তিক মানুষ চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। যারা দিনে আনে দিনে খায়, তাদের অনেকের ঘরে চাল নেই। অনাহারে, অর্ধাহারে তারা দিন পাড়ি দিচ্ছে। ইতোমধ্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেকেই কূল-কিনারা না পেয়ে এদিক সেদিক ছুটে চলেছে। আবার অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থান নিয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামের বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোয় অনেক মানুষ অভুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। বন্যায় ঘরবন্দি এসব মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা জরুরিউজান থেকে নেমে আসা ঢল, টানা বর্ষণ ও নদী ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকেই সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় শতশত গ্রাম ও নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণে বানভাসি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই নৌকা বা অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সিলেটে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি প্রবেশ করেছে। এতে যে কোনো সময় সারা সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তার স্বার্থে ও দুর্ঘটনা এড়াতে ইতোমধ্যে সিলেটের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।

বন্যার্তদের উদ্ধার তৎপরতায় মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা, নিজস্ব নৌকা দিয়ে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার, বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তদের নিয়ে আসা, চিকিৎসা সহায়তা, সীমিত পরিসরে খাদ্য সামগ্রী ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করছেন তারা। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ যে যেভাবে পারেন, সাহায্য করতে আসছেন। সিলেট আবহাওয়া অফিসের ভাষ্যমতে, পুরো জুন মাসজুড়ে বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ওই বৃষ্টির পানি ঢল হয়ে সিলেট বিভাগের সব কটি জেলায় প্রবেশ করেছে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বানভাসি মানুষের কষ্ট, দুর্দশা বাড়তেই থাকবে। তাই পর্যাপ্ত ত্রাণ এবং আশ্রয়কেন্দ্র খোলা জরুরি। বন্যাপীড়িত মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার বেদনাভারাতুর চিত্রের সমান্তরালে জেগে উঠেছে এক মানবিক বাংলাদেশ। দুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘবে সামর্থ্যের সবটুকু নিয়ে মাঠে নেমেছেন বহু মানুষ। কোথাও ব্যক্তি উদ্যোগ, কোথাও সামষ্টিক। সাধারণ মানুষের এই বিপুল ভালোবাসা কিছুটা হলেও দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের সহায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জীবনযুদ্ধের ক্রান্তিকালে এই মমতার পরশটুকুই হয়তো তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading