কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু

কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে পদ্মা সেতু

শামিম আহমেদ । শুক্রবার, ২৪ জুন ২০২২ । আপডেট ০৯:২৫

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আগামী ২৫ জুন। এ নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মধ্যে সমানে বয়ে যাচ্ছে আবেগ, উচ্ছ্বাস, উত্তেজনার ঢেউ। যারা যুগের পর যুগ ধরে এই একটি সেতুর অভাবে সীমাহীন দূর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তারা আজ আত্মপ্রত্যয়ী। অনান্য শ্রেণী-পেশার মতো কৃষক ও কৃষি পণ্যেও ব্যবসায়ীরা উচ্ছ্বসিত। কৃষি নির্ভর জেলাগুলোর কৃষিতে পদ্মা সেতুর ব্যাপক প্রভাব পড়বে, তারা মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। পদ্মা সেতু এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান আলোচ্য। আবাল, বৃদ্ধ, বণিতার এখন আলোচনা একটাই। হাটে-বাজারে, পাড়ায়, মহল্লায়, মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, স্কুলে, কলেজে, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে, গ্রামীণ সড়কের পাশের চায়ের দোকানেও সকল আলোচনাকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ স্বপ্নের পদ্মা সেতু। অনেক ষড়যন্ত্র আর প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এ সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লাখ-লাখ মানুষ ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

অনেকেই চিন্তা করছেন- ভোরে রওনা দিয়ে অফিস আদালতের কাজ সেরে বাড়ি এসে রাতের খাবার খাওয়া যাবে এ সেতুর ফল হিসেবে। অফিস আদালতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা ভোরে বাসে চেপে রাজধানীতে ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবেন। অনুরূপ কৃষিপণ্য সঠিক বাজার পাবে। এ অঞ্চলের অনেক জেলার মানুষ প্রধানত কৃষি নির্ভর। ধান, মাছ ও বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির প্রধান উৎস। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে নারিকেল ও সুপারি জন্মে। সুন্দরবন উপকূলের কিছু মানুষ মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৪৪ হাজার ৩২৮টি। এ জেলার উৎপাদিত শাক-সবজি, মাছ, মুরগী, দুধ, ডিম এখন সরাসরি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে। দ্রুত পঁচনশীল পণ্যও এখন আর পঁচবে না। ১৫ টাকার লাউ ৩ টাকায় বেঁচতে হবে না কৃষকদের। চাষিরা এবার ন্যায্য মূল্য পাবেন।

এ জেলা সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত। এই বাগদা চিংড়ির বিদেশ ছাড়াও দেশের বাজারে বাজারজাত করতে সহজ হবে বলে মনে করেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, এখানে বাগদা ও গলদা মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার চিংড়ি ঘের রয়েছে। বছরে কমপক্ষে ৪০ হাজার টন চিংড়ি ও ৬০ হাজার টন রুই, কাতলা, পাতারি, তেলাপিয়া, পুঁটি, ট্যাংড়া, পাঁচশে, শৈল, মাগুর,পাংগাশ, কই, শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছ উৎপাদিত হয়। সারাদেশে এ অঞ্চলের মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরাসরি ঢাকার বাজারে এই মাছ নিয়ে বিক্রি করতে পারেন না তারা। মাছ পাঠালে ফেরি ঘাটেই পঁচে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। পদ্মা সেতু চালু হলে তারা সরাসরি ঢাকায় মাছ বিক্রি করতে পারবে। এতে বেশি দামে মাছ বিক্রি করে পরিবহন খরচ বাদেও বছরে আরও অতিরিক্ত আয় করতে পারবে তারা।

পদ্মা সেতু চালু হলে দ্রুত ও সহজে রাজধানীসহ সমগ্র বাংলাদেশে যাতায়াত করা যাবে। ফলে ফড়িয়া ও ব্যাপারী বা মধ্যসত্ত্বভোগীদের হাতে বন্দিদশা থেকে চাষিরা রেহাই পাবেন। আক্ষরিক অর্থে দ্রুত এবং সহজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সকল শ্রেণীর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। পদ্মা সেতু থা দক্ষিণাঞ্চলের বিনিয়োগ ব্যবস্থার দ্বার খুলে দিয়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলের মৎস্য, কৃষি, পর্যটন, অকাঠামোসহ সব খাতের প্রসার ঘটবে। এ সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলে মৎস্য চাষ বৃদ্ধি, মৎস্য ও কৃষিনির্ভর শিল্প স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে বলে মনে করেন অনেকেই

পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলসহ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বেকারত্ব দূর হবে এবং দারিদ্রতা হ্রাস পাবে। মোংলা বন্দর জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখার পাশাপাশি অর্থনীতির ধারাকে আরো শানিত করবে। পদ্মা সেতু চালু হলে মোংলা বন্দরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। খান জাহান আলী বিমান বন্দর ও খুলনা-মংলা রেললাইনের কাজ শেষ হলে বিনিয়োগকারীরা বিমান যোগে অথবা সড়ক পথে স্বল্প সময়ে মোংলা বন্দরে আসতে পারবেন। একই সাথে সড়ক , বিমান ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে এ বন্দরের সাথে সারা দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। মোংলা বন্দরের সাথে যোগাযোগ দ্রুত এবং সহজ হওয়ায় শিল্প ও বাণিজ্যের অভূতপূর্ব আগ্রগতির পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী হবে। পদ্মা সেতু ঘিরে এ অঞ্চলে গার্মেন্টস-সহ নানা ধরনের ইন্ডাস্ট্র্রি করতে উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে।পাশ্ববর্তী দেশ গুলো মংলা বন্দর ব্যাবহারে উদ্যোগি হবে।ফলে বন্দরটি অধিক মুনাফা অর্জনের মধ্যদিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখাতে সক্ষম হবে। এতে দক্ষিণাঞ্চলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব দূর হবে তেমনি এ অঞ্চলের দারিদ্রতা হ্রাস পাবে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading