পদ্মা সেতু: সোনার বাংলায় নতুন সূর্যোদয়
মোহম্মদ গনি মিয়া । মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২ । আপডেট ১৭:৩৫
পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল। যা বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সততা, দক্ষতা ও গতিশীল নেতৃত্বের ফলে বর্তমান সরকারের ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বাস্তবে দৃশ্যমান। ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। এ যেন সোনার বাংলায় নতুন সূর্যোদয়। এই সূর্যের আলোতে আলোকিত হবে অবহেলিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। এ যেন অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। আলোর মিছিলে শরিক হতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন দীর্ঘদিন ভোগান্তির শিকার পদ্মার এপার-ওপারের কোটি কোটি বাসিন্দা। ২৬ জুন সকাল ৬টা থেকে দেশের সর্ববৃহৎ এ সেতু দিয়ে সর্বসাধারণের জন্য পরিবহণ চলাচল উন্মুক্ত হয়েছে।
এদিন থেকে আর কোনো মুমূর্ষু রোগী বা সন্তান সম্ভাবনা মাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরিঘাটে অপেক্ষা করতে হবে না। মাত্র ৫ মিনিটেই পার হওয়া যাবে ৬ কিলোমিটারের অধিক দৈর্ঘ্যের এ সেতু। পদ্মা সেতুর মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট পথের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ তৈরি হবে। ফলে এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে অসামান্য অবদান রাখবে। রেল সেতুটি চালুর ফলে দেশের মোট এলাকার ২৯% অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটির অধিক জনগণ সরাসরি উপকৃত হবে। এই সেতুর ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে উন্নয়ন দ্রুতগতিতে হবে।
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রায় অসম্ভব ও দুরূহ এই সেতু নির্মাণ বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সমৃদ্ধির চাকাকে অধিকতর সচল রাখতে বিরামহীনভাবে কাজ করে চলেছেন। দেশ ও দেশের জনগণের জন্য তিনি সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। তার সুনিপুণ দক্ষতার জন্যই একের পর এক মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। পদ্মা সেতুর কারণে সামগ্রিক অর্থনীতি গতিশীল হবে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সারাদেশের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব অনেকাংশে কমে যাবে, যা দেশের অভ্যন্তরে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এডিবির পরিসংখ্যান বলছে, পদ্মা সেতু দিয়ে ২০২২ সালে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে, তার মধ্যে বাস চলবে আট হাজার ২৩৮টি, ট্রাক ১০ হাজার ২৪৪টি, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলবে পাঁচ হাজারের বেশি। এডিবির পরিসংখ্যানে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ২৭ হাজার ৮০০টি। ২০৩০ সালে হবে ৩৬ হাজার ৭৮৫। ২০৪০ সালে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৮০৭টি। দক্ষিণবঙ্গে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক বেড়ে যাবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অসামান্য অবকাঠামোগুলোর একটি। ধীরে ধীরে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই স্তরবিশিষ্ট পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের জনগণের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার।
বাংলাদেশ এখন আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নির্মাণ করেছে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা বহুমুখী সেতু। যেখানে সড়ক ও রেল উভয় মাধ্যমেই সংযোগ স্থাপিত হবে এবং এর মাধ্যমে দেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর বিপস্নব সাধিত হবে। পদ্মা সেতুর নানা অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকেই এই সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল ও অধিকতর চাঙ্গা করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। এই সেতু চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ ও পণ্য পরিবহণে বৈপস্নবিক পরিবর্তন ঘটবে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ অবশ্যই দেশের জন্য মর্যাদার ও গৌরবের।
উলেস্নখ্য যে, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের একমাত্র মেগা প্রকল্প নয়, এর আগেও এদেশে বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে পদ্মা সেতুর বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এই সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ কারও কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেনি। এটি আমাদের আত্মমর্যাদার জায়গাটিকে মজবুত ভিত্তি দিয়েছে। যে দেশে সত্তরের দশকেও শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দারিদ্যসীমার নিচে বাস করত, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে আমাদের অবস্থা ছিল তলাবিহীন ঝুড়ির মতো, সেই দেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু এবং এর সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছে, এটি গৌরবের ও মর্যাদার।
ইউডি/সুস্মিত

