বড় কোন সংশোধনী ছাড়াই অর্থবছরের বাজেট পাশ: উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তনের অঙ্গীকার

বড় কোন সংশোধনী ছাড়াই অর্থবছরের বাজেট পাশ: উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তনের অঙ্গীকার

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৫৫

বড় কোনও সংশোধনী ছাড়াই পাস হয়েছে নতুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট। দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বাজেট নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন আজ শুক্রবার থেকেই কার্যকর হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেট পাশ হয়েছে। পাচার হওয়া সম্পদ দেশে আনার প্রস্তাব বাতিলসহ ছোট ছোট কিছু সংশোধনীতে নতুন বাজেট পাশ হয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক

বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত কণ্ঠভোটে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের চতুর্থ জাতীয় বাজেট পাস হয়। এর আগে, গত ৯ জুন বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে নতুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। এবারের বাজেটে রয়েছে বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির মহাপরিকল্পনা। এছাড়াও বাজেটে রয়েছে নানাবিধ কারণে কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার পরিকল্পনা, তাই এবারও বেড়েছে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তার। বাড়ছে কৃষি খাতের ভর্তুকি। এর আগে, বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত সফলভাবে মোকাবলা করে চলমান উন্নয়ন বজায় রাখা ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’ শ্লোগান সম্বলিত এ বাজেট পেশ করেছিলেন। বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংগৃহীত কর থেকে পাওয়া যাবে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর–বহির্ভূত কর থেকে আসবে ১৮ হাজার কোটি টাকা আর কর ব্যতীত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। ঘাটতির মধ্যে অনুদানসহ বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৯৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা; আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।

পাচার হওয়া সম্পদ দেশে আনার প্রস্তাব বাতিল
গত বুধবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে সরকারের অর্থবিল পাস করা হয়। সেখানে পাচারের অর্থ-সম্পদ দেশে ফেরত আনতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে যেসব সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। সেই অনুযায়ী পাচারের সব ধরনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দেশে আনার প্রস্তাব বাতিল করা হয়। শুধু নির্ধারিত হারে কর দিয়ে পাচার করা নগদ টাকা দেশে আনা যাবে। এ বিষয়ের সংশোধনীতে নতুন করে একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে; তা হলো, দেশের বাইরে কারও সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেলে সেই সম্পদ অর্জনের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে ওই সম্পদের মূল্যের সমপরিমাণ জরিমানা অথবা বাজেয়াপ্ত করা হবে। নতুন বাজেটে এটিসহ আরও কিছু কর প্রস্তাবে পরিবর্তন এনে গতকাল অর্থবিল-২০২২ পাস হয়েছে।

করপোরেট করে শর্ত শিথিল হচ্ছে
করপোরেট কর হ্রাসের সুবিধা পেতে শর্ত শিথিলসহ কিছু সংশোধনী এনে প্রস্তাবিত অর্থবিল পাস হয়েছে। যেসব সংশোধনী আনা হচ্ছে, সেগুলো মূলত আয়কর, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং আমদানি শুল্কসংক্রান্ত। দেশের ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট মহল কিছু ক্ষেত্রে এসব কর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং তা প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবারের মতো এবারও প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। আগের দুই বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারে লিস্টেড এবং নন-লিস্টেড উভয় ধরনের কোম্পানির ক্ষেত্রে বর্তমানের চেয়ে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়। তবে এই সুবিধা পেতে কঠিন শর্ত জুড়ে দেন অর্থমন্ত্রী।

সংশোধনীতে যা যা গুরুত্ব পেয়েছে
পাস হওয়া বাজেটে সরকার আগামী অর্থবছর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বাড়ানো, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছে। এ জন্য বাজেটে দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে চলতি অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় আগামী বাজেটেও করপোরেট করে গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এবারের বাজেট হচ্ছে, ‘সাধারণ মানুষের জন্য, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির জন্য, সকল বাধা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর বাজেট।’

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভোক্তাকে মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে এই বাজেটে। সারাবিশ্বে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহে বিশঙ্খলার মধ্যেও মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে বেঁধে রাখার আশা করছেন তিনি। গত বছরের তুলনায় বাজেটের আকার জিডিপির অনুপাতে কিছুটা কমলেও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কোন খাতে সম্পদের কী পরিমাণ ব্যয় করবেন সেটিও স্পষ্ট করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে মোট সম্পদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, কৃষিতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ, স্বাস্থ্যে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, সুদ পরিশোধে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগে ১২ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও জনপ্রশাসন ব্যয়ে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা
নতুন বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। এনবিআর ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা পেয়েছে। এটি জিডিপির ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নতুন বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে। শতকরা হিসাবে তা ১২ শতাংশ। আগামী বাজেটে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ দুই খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ১৬ হাজার কোটি ও ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেটে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে যথাক্রমে ১৩ ও ৫ শতাংশ।

মোট আয় ও ঘাটতি
সরকারের মোট বাজেটের মধ্যে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এনবিআরবহির্ভূত কর থেকে আসবে ১৮ হাজার কোটি টাকা, আর কর ছাড়া প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির মধ্যে অনুদানসহ বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৯৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। সরকারের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য দেশের মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

উত্তরদক্ষিণ । ০১ জুলাই ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

অর্থবছরের বাজেটের ওপর সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতের ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্রসহ মোট ১৩ জন সংদ সদস্য ৬৬৪টি বিভিন্ন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের আলোচনার পর সবগুলো প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির অনুপস্থিতিতে তাদের মঞ্জুরি দাবি তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৩ জুন সম্পূরক বাজেট পাসের পর ১৪ জুন থেকে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গত ২৯ জুন এই আলোচনা শেষ হয়। প্রায় ৩৯ ঘণ্টার এ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের মোট ২২৮ জন সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। বৃহস্পতিবার রাতে বাজেট পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে এই অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন স্পিকার।

উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের এটি চতুর্থ বাজেট, বাংলাদেশের জন্য এটি ৫২তম। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০তম বাজেট হলেও ২০০৮ সাল থেকে বর্তমান সরকারের টানা ১৪তম বাজেট। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে শাহ্ এ এম এস কিবরিয়া ৬টি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading