নবাব সিরাজউদ্দৌলা মৃত্যু বার্ষিকী আজ: ভাগ্যাহত এক বীর ও দেশপ্রেমিক

নবাব সিরাজউদ্দৌলা মৃত্যু বার্ষিকী আজ: ভাগ্যাহত এক বীর ও দেশপ্রেমিক

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৯:০০

নবাব সিরাজউদ্দৌলার পুরো নাম মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা। তিনি ছিলেন বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয় হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও মৃত্যুর পরই উপমহাদেশ প্রায় দুশো বছরের ইংরেজ শাসন ও শোষণের সূচনা হয়। ২ জুলাই; ইতিহাসের এই দিনে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মীরনের আদেশে মোহাম্মদী বেগ জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের একটি কক্ষে হত্যা করে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল ইসলাম

সিরাজউদ্দৌলা তার নানা নবাব আলীবর্দী খানের কাছ থেকে ২৩ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের ক্ষমতা অর্জন করেন। তার সেনাপতি মীরজাফর, রায়দুর্লভ, বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে।

জন্ম ও বংশপরিচয়
সিরাজউদ্দৌলার জন্ম ১৭৩৩ সালে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর নাতি। আলীবর্দী খানের কোন পুত্র ছিল না। তার ছিল তিন কন্যা। ছোট মেয়ে আমেনার বড় ছেলে হলো সিরাজ। আলীবর্দী খান সিরাজকে খুবই স্নেহ করতেন। তাই তিনি তার উত্তরাধিকার সিরাজকে মনোনীত করেন।

রাজ্যাভিষেক
১৭৪৬ সালে আলিবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে কিশোর সিরাজ তার সাথী হন। আলিবর্দি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বালক বয়সেই পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। তার বয়স অল্প ছিল বলে রাজা জানকীরামকে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু বিষয়টি সিরাজদ্দৌলাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাই তিনি একদিন পাটনা গিয়ে উপস্থিত হন এবং জানকীরামকে তার শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু নবাবের বিনা অনুমতিতে জানকীরাম শাসনভার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে সিরাজ দুর্গ আক্রমণ করে বসেন। ঘটনার সংবাদ পেয়ে আলিবর্দি খাঁ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। সেদিনই আলিবর্দি খাঁ ঘোষণা দেন, “আমার পরে সিরাজই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে।”

ইতিহাসে এই ঘটনাকে সিরাজ-উদ-দৌলার যৌবরাজ্যাভিষেক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই সময়ে সিরাজ-উদ-দৌলার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর। তবে তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তার আত্মীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি ও বিরোধিতা শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম এবং তার স্বামী নোয়াজেশ মোহাম্মদ।

অরাজকতার সময়ে সিংহাসনে আরোহণ
পরিবার ও আত্নীয়রা সিংহাসন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়। এইরকম দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেই আলিবর্দি খাঁ ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। এরপর চারদিকে শুরু হয় প্রচন্ড অরাজকতা এবং ষড়যন্ত্র। ইংরেজরা নবাবের অনুমতি না নিয়েই কলকাতায় দুর্গ সংস্কার করা শুরু করে। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমকে সহায়তা করার জন্য পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে ঢাকার রাজকোষের সম্পূর্ণ অর্থসহ কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠান। এ রকম পরিস্থিতিতেই ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল শাহ কুলি খান মির্জা মোহাম্মদ হায়বৎ জং বাহাদুর (সিরাজ-উদ-দৌলা) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

কুচক্রী সেনাপতিদের বিচার এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া
পরিবার ষড়যন্ত্র ও সব ধরনের গোলমাল মোটামুটি শান্ত হওয়ার পর সিরাজ-উদ-দৌলা সেনাপতিদের অপকর্মের বিচার শুরু করেন। মানিকচন্দ্রকে কারাবন্দি করা হয়। এটা দেখে রাজবল্লভ, জগৎশেঠ ও মীরজাফর সবাই ভীত হয়ে গেলেন। স্বার্থ রক্ষার জন্য সবাই ইংরেজদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন।

পলাশীর যুদ্ধ
১৭৫৭ সালের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কিছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। নবাব বুঝতে পারলেন, সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল। বিদ্রোহের আভাস পেয়ে সিরাজ মীরজাফরকে বন্দি করার চিন্তা বাদ দিলেন। তিনি মীরজাফরকে ক্ষমা করে তাকে শপথ নিতে বললেন।

২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। ইংরেজরা ‘লক্ষবাগ’ নামক আমবাগানে সৈন্য সমাবেশ করল। বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মিরমদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীরজাফর, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ সেখানে নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। সাহসী মিরমদন ইংরেজদের সাথে লড়াই করতে করতে গোলার আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। মীরমদনের পতনের পরেও অন্যতম সেনাপতি মোহনলাল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি যুদ্ধবিরতির বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজবাহিনী কে আক্রমণের পক্ষপাতী ছিলেন।

কিন্তু মীরজাফর আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সৈন্যবাহিনীকে শিবিরে ফেরার নির্দেশ দেন। এই সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা নবাবকে আক্রমণ করে। যুদ্ধ বিকেল পাঁচটায় শেষ হয় এবং নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। তখন কোন উপায় না দেখে সিরাজদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যও কেউ তাকে সাহায্য করেনি। তার আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সৈনিক মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন।

বন্দিত্ব এবং মৃত্যু
মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছে নবাবকে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে লোক পাঠালেন। ১ জুলাই মহানন্দা নদীতে সিরাজের নৌকা আটকে যায়। নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য আসলে কিছু লোক তাকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর জাফরের সৈন্যবাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়। বন্দী হবার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ২ জুলাই মীরজাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে মোহাম্মদী বেগ নামের এক ঘাতক সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করে। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়।

পরিবারের পরিণতি
সিরাজদ্দৌলার স্ত্রী, শিশুকন্যা, সিরাজের মা আমেনা ও খালা ঘষেটি বেগমকে মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে ঢাকায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কিছুদিন পর মীরনের নির্দেশে সিরাজের মা ও খালাকে নৌকায় করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। ক্লাইভের হস্তক্ষেপে সিরাজের স্ত্রী ও শিশুকন্যা রক্ষা পান এবং পরবর্তীতে তাদেরকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। ইংরেজ সরকার প্রদত্ত সামান্য বৃত্তি দিয়ে তাদেরকে জীবন ধারণ করতে হয়েছিল। সিরাজের মৃত্যুর ৩৪ বছর পর লুৎফুন্নেসা ১৭৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading