স্বর্ণালী সম্ভাবনার যুগে বাংলাদেশ

স্বর্ণালী সম্ভাবনার যুগে বাংলাদেশ

অজয় দাশগুপ্ত । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৮:৫০

মহাকালের বিচ্ছিন্নতা ঘুচিয়ে প্রমত্তা পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু, বাংলাদেশের মর্যাদা ও গর্বের প্রতীক। সেতুর সড়ক পথ মোটর গাড়ির জন্য, রেলপথ নির্মিত হয়েছে মিটার ও ব্রড গেজের উপযোগী করে। রাজধানী ঢাকা এবং আরও অনেক জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশিরভাগ জেলার সড়ক পথে দূরত্ব অন্তত ১০০ কিলোমিটার কমিয়ে দেওয়া দৃষ্টিনন্দন সেতুটি গ্যাস এবং টেলিযোগাযোগ-ইন্টারনেট সুবিধা স্থানান্তরেও ব্যবহার হবে। এ সেতু বাংলাদেশের স্থল পথে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বেনাপোল ও ভোমরার ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে আনবে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলিকাতা থেকে এখন বেনাপোল-যশোর-আরিচা-মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসতে অতিক্রম করতে হয় চারশ’ কিলোমিটার পথ। পদ্মা সেতু কমিয়ে দেবে ১৫০ কিলোমিটার পথ। ফেরির জন্য ঘাটে ঘন্টার পর ঘণ্টা এমনকি কখনও কখনও কয়েক দিন অপেক্ষার দুঃসময় পরিণত হবে অতীতের বিষয়ে। সাতক্ষীরার ভোমরা থেকে ৫-৬ ঘণ্টাতেই পৌঁছানো যাবে ঢাকা। পদ্মা সেতু, মংলা ও পায়রা বন্দর এবং অধ্যাধুনিক সড়ক পথ ব্যবহার করে ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়বে এ অঞ্চলের জেলাগুলোর। এ সেতু সড়ক ও রেল পথে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গ সরাসরি সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রেও মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশে শত শত নদনদী রয়েছে। এ গুলোর মধ্যে অন্তত ২০ টিতে বড় সেতু রয়েছে, যা পথের বাধা বিপুলভাবে কমিয়ে দিয়েছে, অর্থনীতিতে সুফল বয়ে এনেছে এবং উপশম করেছে জনদুর্ভোগ। পদ্মা সেতুর মতো ব্যয়বহুল এবং এমনকি আরও বেশি ব্যয়ের অবকাঠামো প্রকল্পও গড়ে উঠেছে কিংবা উঠছে। কিন্তু সামাজিক-অর্থনৈতিক, ভৌগলিক ও পরিবেশগত তাৎপর্য বিবেচনায় পদ্মা সেতু অনন্য, অতুলন। রাজধানী ঢাকাসহ অনেক জেলাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনপদকে কার্যত পড়শীতে পরিণত করা সেতুটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মর্যাদা বিপুলভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং তার সহযোগী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দশকের পর দশক ধরে বিপুল সংখ্যক স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ওপর অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে রাজনৈতিকভাবে যে অন্যায় প্রভাব বিস্তার করে চলছে, নিজের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত তা উপেক্ষায় প্রেরণা জোগাবে, সন্দেহ নেই।

পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বাড়তি সংযোজন হবে, বিশেষভাবে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা ও যশোর অঞ্চলের জেলা-উপজেলায়। অর্থনীতিতে গতি আসবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। বাংলাদেশে এখন তিনটি সমুদ্র বন্দর রয়েছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, বাগেরহাটের মংলা ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর। কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে নির্মিত হচ্ছে নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর। বর্তমানে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের তিন-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার। কিন্তু পদ্মা সেতু পথে রাজধানী ঢাকা থেকে মংলা বন্দরের দূরত্ব দাঁড়াবে ১৭০ কিলোমিটার। বিভাগীয় শহর বরিশাল থেকে পায়রা সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটার। বরিশাল থেকে মংলা বন্দরের দূরত্ব মাত্র ১১৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে, বরিশাল শহর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সড়ক পথে দূরত্ব এর অন্তত তিন গুণ। যদি মংলা ও পায়রা নৌ বন্দরের সুবিধা বাড়ানো যায়, তাহলে বরিশাল অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যের উদ্যোক্তারা আমদানি-রফতানির জন্য এ দুটি বন্দরই ব্যবহার করবেন, তিন গুণ পথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে যাবেন না। এমনকি ঢাকার ব্যববায়ীদের কাছেও চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি মংলা ও পায়রা বন্দর আকর্ষণীয় হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার অনুমান এক দশকে কেবল বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলায় ৫০০ থেকে ১০০০ শিল্প স্থাপিত হবে, যেখানে ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে।

বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।আর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থাপনা হলো পদ্মা সেতু। এই সেতু বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিপদে ফেলতে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিল করা সরকারের জন্য আশীর্বাদই হয়েছে। এতবড় বৃহৎ প্রকল্প যে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে করতে পারে, তার সক্ষমতা প্রমাণ হয়েছে। যারা মনে করত বিদেশি সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবে না, পদ্মা সেতু তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব মোড়লদের মোড়লগিরিও কমে এসেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সগৌরবে যাত্রা শুরু করলো পদ্মা সেতু। এই সেতু বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার ও সততার প্রতীক। সক্ষমতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা, অদম্য সাহস, স্বাধীনচেতা মনোভাব, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও সর্বোপরি দেশের প্রতি ভালোবাসা এই সেতু তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যথার্থই বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে একমাত্র কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। যতদিন পদ্মা সেতু থাকবে, ততদিন এই সেতুর সাথে মিশে থাকবে শেখ হাসিনার নাম। পদ্মা সেতু শেখ হাসিনার অমর কীর্তি হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading