বাজারে টিসিবি: দরকার সুষ্ঠু মনিটরিং স্কোয়াড
মোল্লা জালাল । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:২০
গোটা জাতির মন থেকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের রেশ কাটতে না কাটতেই বাজারে আগুন লাগার খবর আসা শুরু হয়েছে। চাল, ডাল, তেল, লবণ, পিঁয়াজ, মরিচ সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ফলে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা জাগছে, সামনে কী হবে। নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানিয়ে সরকার জাতির মর্যাদা ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক সরকারের আরো অনেক সাফল্য আছে। শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। কেন পারে না, এ প্রশ্নের সদুত্তর মেলে না।
সামনে কোরবানির ঈদ। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে বাজারে হুহু করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। চট্টগ্রামের আড়তদাররা বলছেন, বন্যার কারণে নাকি সরবরাহ কমে গেছে। কী অদ্ভুত যুক্তি! সরকার বলছে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চাল, ডাল, আদা, রসুন, পিঁয়াজ, মরিচ, তেল, নুন, কোনো কিছুর অভাব নেই। অন্যদিকে দেশীয় পিঁয়াজ উৎপাদনের অঞ্চলগুলোতে বন্যা নেই। তাহলে দাম বাড়বে কেন? এ দেশে প্রতিটি উৎসব এবং বিশেষ সময়ে একশ্রেণির মুনাফাখোর পকেট কাটে, বাজার লোটে। সরকার হুঁশিয়ারি দেয়, অভিযান চালায়। তাতে জিনিসপত্রের দাম কমে না। গণমাধ্যমে নিয়মিত রিপোর্ট হয়, বাজার নিয়ে রাজনীতি গরম হয়; কিন্তু দাম বাড়তেই থাকে। এর ব্যত্যয় প্রয়োজন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এমনকি পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোকেও মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হলে অবস্হার পরিবর্তন ঘটবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হলে আপনা থেকেই মুনাফাখোর চক্র দমন হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষের মনে প্রতিবাদের সাহস বাড়বে, সংযমী হবে।
সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ বাহিনী বানিয়েছে। তাদের তৎপরতায় দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা কমে গেছে। দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য সময়ের প্রয়োজনেই একটি বিশেষ বাহিনী করা হলে দোষের কী আছে? নতুন কোনো বাহিনী বানানোয় সমস্যা থাকলে র্যাব সদস্যদের মধ্যে থেকেই ‘স্কোয়াড’ করা যেতে পারে। তাদের দেখলেই যেন বোঝা যায় ‘বাজার মনিটরিং স্কোয়াড’।
ঐ রকম ইউনিফর্মড কোনো বাহিনী থাকলে সাধারণ মানুষ তাদের কাছে কোথায়, কারা জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে জানাতে পারবে। বহু ডিপার্টমেন্ট আছে সারা দেশে যাদের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। বলতে গেলে তারা সারা বছর শুধু বসে বসে বেতন খায় আর ভাউচার বানায়। তাদেরকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। এদেশে প্রতিটি উৎসব এবং বিশেষ সময়ে একশ্রেণির মুনাফাখোর পকেট কাটে, বাজার লুটে। সরকার হুঁশিয়ারি দেয়, অভিযান চালায়। তাতে জিনিসপত্রের দাম কমে না। গণমাধ্যমে নিয়মিত রিপোর্ট হয়, বাজার নিয়ে রাজনীতি গরম হয় কিন্তু দাম বাড়তেই থাকে। কেউ বলে ‘সিন্ডিকেড’ বাজার চালায়। কারো মতে, সরকারের নীতি নির্ধারকদের অনেকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোয় সহযোগিতা করে। আরো কত কথা। কিন্তু মানুষের ভোগান্তি কমে না।
দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যে কাউকে বাধা দেওয়া বা শাস্তি দিয়ে শত্রুতা বাড়ানোর কোনো দরকার নেই। সরকার সারা দেশে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, এটা চলবে ১০ জুলাই পর্যন্ত। কেন, সারা বছর ধরে চলতে সমস্যা কোথায়? সরকার বাজার থেকে ন্যাঘ্য মূল্যে পণ্য কিনে খরচ বাদে সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করবে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর অজুহাতে মুনাফাখোররা যুক্তি দেখায় আমদানি মূল্য বেশি হওয়ার কারণে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। এ নিয়ে তর্ক করে আখেরে কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। তারা তাদের মতো আমদানিকৃত পণ্যের দাম নির্ধারণ করুক। সরকার নিজে নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরি পণ্য আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশের খোলাবাজারে বিক্রি করলে কারো কিছু বলার থাকবে না। টিসিবির দোকান থেকে সর্বস্তরের মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারলে বাজার লুটেরা মুনাফাখোরদের কিছুই করার থাকবে না। সাধারণ মানুষের চাহিদা শুধু চাল, ডাল, তেল, নুন, পিঁয়াজ, মরিচ, আদা, রসুনের। এসব পণ্য বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকার নিজেই আমদানি করে টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করলে সারা বছর বাজার স্হিতিশীল থাকবে। ভোক্তা অধিকারদপ্তরকে আরো বেশি ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়ে তাদের কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বীরের জাতি বাঙালির বাংলাদেশ পারে। এই সক্ষমতার মর্যাদা ধরে রাখার জন্যই দরকার দেশপ্রেমিক মানুষের জাতীয় ঐক্য। রাজনীতির ফসল ভাগাভাগি বা বেনিফিশিয়ারিদের সমঝোতায় প্রয়োজনে জোড়াতালি দিয়ে সরকার বানানো যায়। কিন্তু সে ধরনের সরকারের ভেতরে শক্তি থাকে না। সরকারের ভেতরের একেক জন একেক সুরে কথা বলায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তাই দলের নয়, ঐক্য দরকার সাধারণ মানুষের, যা ‘পদ্মা সেতু’র উচ্ছ্বাসে প্রকাশিত হয়েছে। মাত্র একটি বছর বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আগামীর বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের সক্ষমতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। দেশের সব শ্রেণি-পেশার সব মানুষের এখন উচ্চ স্বরে সে কথা বলার সময় এসেছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

