দুর্নীতির দুর্গতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ বাড়াতে হবে
রায়হান আলী । রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০
সামাজিক অবক্ষয়ের আরেক নাম দুর্নীতি। একটি উন্নত দেশ ও জাতি গঠনে যেমন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দরকার তেমনি একটি দেশ, জাতির উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় সে দেশের দুর্নীতি। দুর্নীতি নামক এ ভাইরাসটি কোনো রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নে প্রধান বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতি দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো আদর্শের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক অসাধুতা বা বিচ্যুতিকে নির্দেশ করে। বৃহৎ পরিসরে ঘুষ প্রদান , সম্পত্তির আত্মসাৎ এবং সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করাও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত। আর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান অন্তরায় বা বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়ায় এই দুনীতি।
বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০২১ সালের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) ১৪৭ নম্বরে। বাংলাদেশের এই অবস্থানকে খুবই হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি জানান, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আটটি জরিপের ফলাফল থেকে সূচকটি নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে টিআই প্রতিবেদনে তালিকাভুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। পরে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
কম দুর্নীতিগ্রস্থ ১০টি দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নরওয়ে, সিঙ্গাপুর ও সুইডেন; এই তিনটি দেশেরই স্কোর ৮৫। আর ৮৪ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। এরপর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ড (স্কোর ৮২), পঞ্চম লুক্সেমবার্গ (৮১), ষষ্ঠ জার্মানি (স্কোর ৮০), সপ্তম যুক্তরাজ্য (স্কোর ৭৮) ও অষ্টম স্থানে রয়েছে হংকং (৭৬)। ৭৪ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে নবম স্থানে আছে কানাডা, আয়ারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও অস্ট্রিয়া। যৌথভাবে দশম স্থানে আছে ৭৩ স্কোর নিয়ে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জাপান ও উরুগুয়ে।
সাম্প্রতিক সময়ের নানান কেলেঙ্কারির কারণে দুর্নীতির সূচকের তেমন পরিবর্তন আনা সম্ভবপর হয়নি। তার মধ্যে অন্যতম দুর্নীতির কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো হল- সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের অর্থ লোপাট, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপের দুর্নীতি, বহুল আলোচিত রূপপুরের বালিশ কাণ্ড, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, ক্যাসিনো কাণ্ড, জনতা ব্যাংকের অ্যাননটেক্স, দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ কাজে রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহার, গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণ কাজে দুর্নীতি ইত্যাদি।
এসব আলোচিত কেলেঙ্কারিসহ জনগণের কাছে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দুর্নীতির কারণে আমরা আজ দুর্নীতির সূচকে গত বছরের তুলনায় তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে চলছে এদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম। সেই উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে আজ আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে এই শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে। এদেশ যখন এমন উন্নয়নে চলমান তখন একদল কুচক্রী মহলের কারণে সম্প্রতিককালে কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তো বীরের জাতি তাই কোনো অপশক্তিকে আমাদের ভয় পাবার নয়। তাই এ দুর্নীতি ব্যাধির মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। আমরা কি বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশে পরিণত করতে পারিনা? দুর্নীতিকে এ দেশের মাটি থেকে চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করার আরেকটি মুক্তিসংগ্রামে আমরা কি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না? নিশ্চয়ই সকলের সার্বিক সহযোগিতায় দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবো এদেশকে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে আমরা বদ্ধ পরিকর হলেও বাস্তবে কতটা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি সেটা প্রশ্নই থেকে যায়। মা-মাটির স্বার্থ উদ্ধারেই যার মূল লক্ষ ছিল আমরা তার রেখে যাওয়া স্বপ্নের কতটা মূল্য দিয়ে যাচ্ছি? মূল্য আমাদের দিতেই হবে। এদেশ থেকে দুর্নীতির আখড়া মূলোৎপাটন করে নিশ্চিহ্ন করতে সকল প্রকার অনিয়ম। দুর্নীতির প্রতিরোধে সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট আইন করেছে। দেশের সবক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন করার দায় শুধু সরকারের ওপর দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমরা সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদেরকে সচেতন ও দুর্নীতিমুক্ত রাখি তাহলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজ হবে।
লেখক- সমাজ বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

