পারিবারিক বন্ধন: শিকড় বাঁচলে বৃক্ষ বাঁচবে

পারিবারিক বন্ধন: শিকড় বাঁচলে বৃক্ষ বাঁচবে
পারিবারিক বন্ধন _উত্তরদক্ষিণ

ওয়াহিদুজ্জামান রাসেল । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:২০

একটি বৃক্ষের প্রধান উপাদান তার শিকড়। শিকড়ের কাজ হলো মাটির গভীরে গিয়ে রস আশ্বাদন করে শাখা-প্রশাখাকে পরিপুষ্ট করা। বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখা। যদি কোনো বৃক্ষের শিকড় কেটে ফেলে বৃক্ষের মাথায় পানি দিতে চেষ্টা করি তাহলে বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা বোকামি মাত্র। তেমনি একটি দেশের মূল শিকড় তার পরিবার আর তার শাখা-প্রশাখা হলো সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ। সুস্থ পরিবার ছাড়া একটা দেশ কখনো সুস্থভাবে চলতে পারে না। আসুন দেখা যাক একটি সুস্থ পরিবার কীভাবে একটি সমৃদ্ধ ও সুস্থ দেশ উপহার দিতে পারে। সাধারণত পরিবার বলতে আমরা মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, ফুফি একত্রে বসবাস করাকে বুঝি। স্নেহ, মায়া-মমতা, সহযোগিতার বন্ধন হলো পরিবার। এই পরিবারে রয়েছে দুই ধরনের সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক ও বৈবাহিক সম্পর্ক। রক্তের সম্পর্ক পরিবারের মেরুদন্ড। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিবিড় আত্মার সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে বৈবাহিক সম্পর্ক হলো যৌন সম্পর্ক যেটা বৈবাহিক বন্ধন দ্বারা সংগঠিত। এখানে সন্তান-সন্ততির জন্মদান ও লালন করা।

পরিবার সমাজ জীবনের শাশ্বত বিদ্যালয়। শিশুর লালন-পালনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের দৈহিক ও মানসিক পরিচর্যা ও আত্মবিকাশের শিক্ষা পরিবারের মধ্যে শুরু হয়। শিশুদের চাল-চলন, রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার, নৈতিক শিক্ষা পরিবার থেকে শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কারণ, পিতামাতা সন্তান-সন্ততিতে অপত্য স্নেহ ও অনাবিল মমতার বন্ধনে লালন-পালন করে। সেই স্নেহ-মমতা অলক্ষ্যে সন্তানদের মনে রেখাপাত করে প্রীতির কমল পরশ শিশুমনকে সমৃদ্ধি করে তোলে। ফলে শিশু ধীরে ধীরে বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ জীবনের চলার পথে উদারতা, সহনশীলতা, দয়াময়তা, সাধুতা, সততা, সংযম ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা প্রভৃতি সুকুমার সামাজিক মূল্যবোধের অধিকারী হয়। যার কারণে একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা, বিপদে সাহায্য করা, রোগ-শোকে সেবা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা এই অনুভূতিগুলো তার ভিতর বিস্তার লাভ করে। বস্তুুত পরিবারই মানবিক মূল্যবোধের উৎস। মূল্যবোধের বিকাশ পরিবারের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।

পরিবার মানুষের প্রথম ও শেষ আশ্রয়স্থল। পরিবারের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার মধ্যে নানা ধরনের দীক্ষা চলে। এদের মধ্যে সামাজিকীকরণ অন্যতম দীক্ষা। এখানে ছোট বড়দের মধ্যে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক বিদ্যমান। পারিবারিক নিয়ম-কানুন পরিবারের সব সদস্যকে মেনে চলা অপরিহার্য। তাদের কথা শোনা, আদেশ মেনে চলা, পরামর্শমতো কাজ করার মধ্যদিয়ে শিশু ও কিশোরদের নাগরিকত্ব প্রশিক্ষণ শুরু হয় এবং নাগরিক কৃষ্টির বিকাশ ঘটতে থাকে। পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক চর্চা ও আলাপ-আলোচনা হতে বিশেষ ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস শাসক ও শাসনব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ গড়ে ওঠে যা কোনো মানুষকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল গঠনে, দলের সদস্য হতে কিংবা কোনো দলকে সমর্থন করতে প্রেরণা জোগায়। এভাবে পারিবারিক সংস্কৃতি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক নাগরিক পরিগ্রহ করে। ফলে সে একসময় দেশের শাসনকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। যার কারণে সে চেষ্টা করলেও তার পারিবারিক শিক্ষার বাইরে কোনো অনৈতিক কাজ করতে পারে না। এভাবে সুসভ্য জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

অন্যপক্ষে যেসব পরিবারের মধ্যে কোনো বন্ধন বা সুসম্পর্ক নেই সেসব পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠা সন্তানরা বিশৃঙ্খলা হয়। সাধারণত বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া, বিবাদ, মনোমালিন্য ও বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে ভেঙে পড়তে পারে পরিবার। বাবা-মায়ের চারিত্রিক বৈকল্যের কারণে সন্তানরা অসামাজিক কার্যকলাপ ঘুষ, দুর্নীতি ও অস্থির মানসিক অবস্থার জন্য সমঝোতার অভাবে পরিবার ভেঙে পড়ে। অনেক সময় বহুবিবাহের কারণেও পরিবার ভেঙে যায়। ফলে ভেঙে পড়া পরিবার তার সদস্যদের সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারে না। রিবারের মধ্যে গড়ে তুলি হৃদ্যতার বন্ধন। ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করি পরিবার। শিশু- কিশোরদের নৈতিক শিক্ষায় বড় করি। স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসা, প্রীতি, সহানুভূতি প্রভৃতি মানসিক বৃত্তিগুলোর মাধ্যমে শিশুদের গড়ে তুলে একটা সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠন করি। আর এই সমাজই উপহার দেবে একটি সুস্থ দেশ ও জাতি। কারণ আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading