যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
যৌন নির্যাতন_উত্তরদক্ষিণ

মার্জিয়া রহমান । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:৪০

দিনে দিনে বাড়ছে যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এর ফলে দেশের সচেতন মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে ২৯৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন। এর মধ্যে ৯ জন কন্যা ও ১০ জন নারীসহ ১৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইডের উপ-পরিষদ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

অন্যান্য অপরাধের তুলনায় যৌন নির্যাতন বা সহিংসতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বিগ্ন করছে। সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারহীনতার কারণেই যৌন সহিংসতা বাড়ছে। অপরাধ করে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটি সংস্কৃতি চলছে। এর পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয়ও একটা কারণ। মনে রাখতে হবে সমাজে নারীর অগ্রগতি হয়েছে এটা যেমন সত্য একইভাবে সত্য পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির এখনো পরিবর্তন হয়নি। যার কারণে নারী ঘরে বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে। সমাজ পরিবর্তন মানে সামাজিক কাঠামো ও সমাজের মানুষের কার্যাবলি ও আচরণের পরিবর্তন। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। বিশৃঙ্খল অপরাধপ্রবণ অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে বসবাস করে উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া যায় না। এমন সমাজে হত্যা সন্ত্রাস যৌন নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ করা সহজ কাজ নয়।

আমরা চাই, পরিকল্পিত ও বিন্যস্ত সমাজ। নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি- যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না। কূপমন্ডূকতা যেমন আমাদের সমাজকে দিন দিন গ্রাস করছে, তেমনি নারীর ক্ষেত্রেও যেন সমাজ দিন দিন আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। নিষ্ঠুরতার বলি হচ্ছে নারী। কোনোভাবেই তা রোধ করা যাচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবে, নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হবে- এটা যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে শুধু মফস্বল বা গ্রামে নয়, রাজধানী ঢাকাতেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কারও বটে।

শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শিশুরা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বা বড় শিশুর দ্বারা যৌনতামূলক আচরণের শিকার হয়। এক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন বলতে বুঝায় কোনো শিশুর যৌনতামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা যার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির শারীরিক সন্তুষ্টি লাভ বা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া। এই ধরনের যৌন নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে কোনো শিশুকে যৌনতামূলক কাজ করতে বলা বা চাপ দেওয়া, যৌনাঙ্গের প্রদর্শন করতে বলা বা বাধ্য করা, শিশুকে পর্নো দেখানো, কোনো শিশুর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে যৌন সঙ্গীর মতো আচরণ করা, শিশুর যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা বা দেখা বা শিশু পর্নো তৈরি করা এবং শিশুদের কাছে যৌনতামূলক সেবা বিক্রয় করা। শিশু যৌন নির্যাতনের প্রভাবের মধ্যে লজ্জা ও আত্মগস্নানি, হতাশা, দুশ্চিন্তা, ট্রমাপরবর্তী স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, আত্মসম্মানের অভাব, যৌন অক্ষমতা, প্রজনন অঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, আসক্তি, নিজেকে আঘাত করা, আত্মহত্যার প্রবণতা, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পুনরায় ওই ঘটনা ঘটানো/ঘটনার শিকার হওয়ার প্রবণতা, বুলিমিয়া নার্ভোসা এবং শিশুর শারীরিক আঘাতও হতে পারে অন্যান্য সমস্যাগুলোর একটি।

চারদিকের অবস্থা দেখে আমাদের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণেই মূলত এমনটি হচ্ছে। রাষ্ট্রের মধ্যে শৃঙ্খলা না থাকলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এটাই স্বাভাবিক; যার কারণে সামাজিক অবক্ষয় এত চরমে পৌঁছেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র ভয়ঙ্করভাবে উদ্বেগজনক। মানুষ অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ লোপ পেয়েছে। অন্যায়টাকেই তারা স্বাভাবিক মনে করছে। সামাজিক সুস্থতা আনায়নের পাশাপাশি নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য এ ধরনের অবক্ষয়কে প্রতিরোধ করতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে। এ জন্য ব্যাপকভাবে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক- সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading