নদীমাতৃক দেশে কেন নাব্য সংকট

নদীমাতৃক দেশে কেন নাব্য সংকট

জুবায়ের আহমেদ । সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:২৫

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। খাল বিল, নদী, হাওড়ে ভরপুর আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌপথ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনের অবসান ঘটার মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও বাংলাদেশের মানুষের যোগাযোগের বৃহৎ মাধ্যম ছিল নৌপথ। ২০০৩-০৪ সালের দিকেও আমরা বর্ষাকালে নৌপথ দিয়ে দূরের হাঁট-বাজার ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। সেই সময়েও নদী-খালগুলোর গভীরতা ছিল ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার চলাচলের জন্য যথেষ্ট, নদীগুলোও স্বরূপ ধরে রেখেছিল। কিন্তু সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকায় মানুষ সড়ক পথে যাতায়াত শুরু করায় এবং নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ধীরে ধীরে নৌপথ তার প্রাণ হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

বাংলাদেশের এখনো বহু অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। এ ছাড়া বহু অঞ্চলে নৌপথে যাতায়ত করা যায় সারা বছর। কিন্তু সড়ক পথে যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরকার কর্তৃক সড়ক পথের যোগাযোগকে প্রাধান্য দেওয়ার বিপরীতে নৌপথ নিয়ে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করায় দিন দিন নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ছোট ছোট নদী ও খালগুলোর দুই পাশে অবৈধ দখলদারদের কারণে নদী-খালের আয়তন ও গভীরতা কমছে। ফলে বর্ষাকালেও ঠিকমতো পানি হয় না গ্রামের খালগুলোতে। পানি না হওয়া এবং নদী-খালের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ বিভিন্নভাবে অবৈধ দখল করে রাখার কারণে বর্ষাকালেও নৌ যোগাযোগ বন্ধ থাকে। বেদখল ও খনন না করার ফলে নদী ও খালগুলোতে নাব্য বজায় না থাকার কারণে পানি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, যার কারণে বর্ষকালেও কৃষি জমিগুলোতে পর্যাপ্ত পানি ওঠে না অনেক এলাকায়। ফলে নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান দেশটিতে বর্ষা মৌসুমে পাট ও ধান উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে।

সম্প্রতি সিলেট বিভাগ ও কুড়িগ্রাম জেলাসহ বহু অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। এই বন্যার পেছনে নদীগুলোর নাব্য হারানোও দায়ী কম নয়। সিলেটের বন্যায় ভারত থেকে পানি ছাড়াকে দায়ী করা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এটিই বন্যা হওয়ার একমাত্র কারণ নয়। নাব্য সংকটের কারণে পানিপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটায় এক এলাকায় পানি জমে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে নদ-নদীগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে দেশব্যাপী নাব্য সংকটের খবর পাওয়া যায় অহরহ। এই নাব্য সংকটের মূলেই খনন কার্যক্রম না করা। দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন মতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৮৮টি নৌপথে নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নৌপথে ঝুঁকি নিয়ে দোতলা লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করছে। বাকি ২৭টি নৌপথ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দেশব্যাপী যত নদী ও খাল আছে, সবগুলোর একই চিত্র। নাব্য সংকটের ফলে নদীমাতৃক দেশ তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী গত ৪০ বছরে ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে। দূষণ-দখল ছাড়াও নিয়মিত নদী খনন না করাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আশার কথা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, হাওড়াঞ্চল ও পার্বত্য এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে ১৭৮টি নদ-নদী খনন করে প্রবাহমান করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিস্নউটিএ) মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। আশার মধ্যেও হতাশার ব্যাপার হলো ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। নৌপথে চলাচল বেশ আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হিসেবে প্রত্যেক অঞ্চলেই নৌপথে যোগাযোগ করার মতো নদী আছে। কিন্তু সড়ক পথের উন্নয়নের দিকে অতিরিক্ত নজর দিতে গিয়ে নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের নদ-নদীতে নাব্য বজায় রেখে নৌপথের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে নৌপথ নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রাম-গঞ্জের খাল, বিলের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। নৌপথ খননের মাধ্যমে সচল রাখতে পারলে সড়ক পথের বর্তমান উন্নয়নের সঙ্গে মিলে-মিশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে প্রিয় স্বদেশে।

লেখক- কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading