ভ্লাদিমির লেলিন: আজও প্রাসঙ্গিক এই বিপ্লবীর সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদ
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২ । আপডেট ২০:২৫
রাশিয়ার বুকে জারতন্ত্রের অবসানে যে সর্বাত্মক বিপ্লব হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডি আই লেনিন। বিশ্ব ইতিহাসের মহাবিপ্লবীদের তালিকায় ভ্লাদিমির লেলিন এক অবিস্মরণীয় নাম। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্যবাদী মানুষ তারে সশ্রদ্ধ অর্থ নিবেদন করে। সর্বহারা মানুষের মুক্তির দিশারী মহামতী ভ্লাদিমির লেলিনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম অনিক।
তৃতীয় বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদের শোষণে জর্জরিত ও দরিদ্র দেশগুলোর জনসাধারণ একদিন রাশিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে এবং প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভের বিশ্বাসঘাতকতায় রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে কয়েক বছর পূর্বে। তবু দেশে দেশে এখনো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে লেনিন–মার্কসের পথ ধরে। লেনিনের মৃত্যু নেই।
কে ছিলেন ভ্লাদিমির লেলিন?
ভ্লাদিমির লেলিন ছিলেন একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদ। লেনিন অক্টোবার বিপ্লবের বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯২২ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তার প্রশাসনের অধীনে, রাশিয়া এবং তারপরে বৃহত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত একদলীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। আদর্শগতভাবে একজন সমাজতান্ত্রিক হয়ে তিনি মার্কসবাদের একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ বিকাশ করেছিলেন যা “লেনিনবাদ” নামে পরিচিত। তার ধারণাগুলি মরণোত্তরভাবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ।
শিক্ষক বাবার ছেলে লেলিন
লেনিনের জন্ম হয় ১৮৭০ খ্রিঃ ২২শে এপ্রিল। তার জন্মস্থান ছিল রাশিয়ার ভলগা নদীর তীরে সিনবিষ্ক শহরে। পরে লেনিনের সম্মানে এই শহরটির নাম হয় উলিয়ানভস্ক। লেনিনের বাবা ল্যা নিকোলায়েভিচ একজন স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন। শিক্ষক হিসাবে তার খুব সুনাম ছিল। লেনিনের মা আলেক্সান্ড্রাভনা উলিয়ানভা ছিলেন ডাক্তারের মেয়ে। তিনি ফরাসি, জার্মানি, ইংরাজী ভাষা জানতেন। তিনি সঙ্গীতানুরাগীও ছিলেন।
লেলিনের ছদ্মনাম
লেনিনের সম্পূর্ণ নাম ভ্লাদিমির ইলভিচ ইলিয়ানভ। বিপ্লবী দলে প্রবেশ করার পর পুলিশের চোখে ধুলো দেবার জন্য তাকে ছদ্মনাম নিতে হয়েছিল। তিনি ‘লেনিন’ এই ছদ্মনাম নিয়ে ছিলেন। পরে এই নামেই বিশ্ব পরিচিতি অর্জন করলেন।
শৈশবেই সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তান লেনিন কিশোর বয়স থেকেই সক্রিয়ভাবে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করেন। জারকে হত্যা করার চেষ্টার অভিযোগে তার বড় ভাইকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিলো। এই ঘটনা লেনিনকে গভীরভাবে মর্মাহত ও আলোড়িত করেছিলো। লেলিন রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত হয়ে পড়েন। তবে লেলিন তার বড় ভাইয়ের মতো সন্ত্রাসবাদী পথে না গিয়ে বিপ্লবী গণসংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক বিপ্লব সাধনের নীতি গ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবন ও প্রথম গ্রন্থ রচনা
লেনিন ১৮৯১ সালে ২১ বছর বয়সে সেন্ট পিটাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি গভীরভাবে মার্কস এঙ্গেলসের বইপুস্তক পড়তে থাকেন এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সেগুলো বিশ্লেষণ করে তৎকালীন পরিস্থিতিতে সেগুলোর প্রয়োগ সম্বন্ধে সচেতন হতে থাকেন। লেনিন ১৮৯৪ সালে ২৪ বছর বয়সে ‘জনতার মিত্র কারা এবং সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের পদ্ধতি কি?’ এই শিরোনামে তার প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন।
নতুন দল গঠন ও বিপ্লবী আন্দোলন
১৮৯৮ সালে তিনি ‘বলশেভিক পার্টি’ নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। এই দলের সহায়তায় ভ্লাদিমির লেলিন রাশিয়ায় কমিউনিস্ট বিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। লেনিন ১৯০০ সালের দিকে নিজ দেশ রাশিয়া ত্যাগ করে ইউরোপের অন্য এক দেশে চলে যান। সেখান থেকে ‘ইসক্রা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করে রাশিয়ায় তা প্রেরণ করে রাশিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলনকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। ১৯০৩ সালে তারই নেতৃত্বে রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলশেভিক পাটির মাধ্যমে। ১৯০৫ সালের রাশিয়ায় জারের বিরুদ্ধে প্রথম বিপ্লবী আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা
পরবর্তীতে অনেক সংগ্রামের পর লেনিন ১৯১৯ সালের ৭ই নভেম্বর রাশিয়ায় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। জার নিকোলাস সপরিবারে নিহত হন। লেনিন ক্ষমতায় আসার পর মার্কসবাদের বাস্তব প্রয়োগ করে রাশিয়ায় সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যান। সকল কলকারখানা থেকে ব্যক্তিমালিকানা প্রত্যাহার করে সেগুলোতে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিমধ্যে তাকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকারিরা একবার গুলী করে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েও সে যাত্রায় বেঁচে যান। মেহনতী মানুষের মুক্তির দিশারী মহামতি লেনিন অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী। তিনি মার্কসবাদের ওপর অনেক বই লিখে যান।
নতুন অর্থনৈতিক নীতি
ভ্লাদিমির লেলিন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়নের অর্থনৈতিক তত্ত্ব দেন, যা “লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি” নামে পরিচিত। তার ভাবধারাকে ‘লেনিনবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়, যা মার্কসবাদের উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া সাম্যবাদের পথ ধরে একদিন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হয়।
সমাজতান্ত্রিক নেতার মৃত্যু
মহান মানবতাবাদী লেনিন ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখে ৫৪ বছর বয়সে মস্কোর নিকটবর্তী গোর্কি শহরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন। আজও সারা বিশ্বের বিপ্লবীও শ্রমজীবী সর্বহারা মানুষের মনে লেনিন জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো বেঁচে আছেন।
ইউডি/অনিক

