দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব বাড়ছে

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব বাড়ছে

মোহম্মদ মাসুম বিল্লাহ । বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০

জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়া শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বর্তমানে এ খাত রপ্তানি আয়ের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এখাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পণ্যে উচ্চমূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পখাতকে জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬-এ উচ্চ অগ্রাধিকার খাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক সমীক্ষায় জানা যায়, বিশ্বব্যাপী চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ বাংলাদেশ পূরণ করে। বিগত কয়েক দশকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে কাঠামোগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে এখাতের ৬২ শতাংশ রপ্তানি আয় ফিনিসড লেদার হতে এলেও ২০১৪ সালে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ শতাংশে। অপরদিকে, ২০০৩ সালে এই খাতের মোট রপ্তানি আয় পাদুকাশিল্প হতে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালে সেটি ৪৩ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় পাদুকা শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও গুণগতমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি উদ্যোক্তারা এই খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসছে।

বর্তমানে বিশ্বে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থের বাজার রয়েছে। এ বিশাল বাজারের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ধরার জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামালের যোগান আমাদের দেশে রয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতিবছরে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া জবাই করা হয়। এ বিশাল পরিমাণ কাঁচামালকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতিতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার গুণগতমান ভালো হওয়ায় আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হতে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৬১ লাখ ডলার, যা পূর্ববর্তী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতির অন্যান্য খাতের ন্যায় উৎপাদনমুখী চামড়া শিল্প খাতও ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

দেশে উৎপাদিত চামড়ার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শুরু করেছে। দেশে চামড়াজাত শিল্পের ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল চাহিদা মিটিয়ে অনেক চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। সরকার এ চামড়া খাতকে রপ্তানিমুখী করতে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের মানোন্ননের লক্ষ্যে ঢাকার হাজারিবাগে ইতালি সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ লেদার সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেন্টারটি চামড়া শিল্পের মানোন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়ে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অতি সম্প্রতি ওয়েট ব্লু চামড়া চাহিদা মোতাবেক বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। এক কোটি বর্গফুটের বেশি ওয়েট ব্লু চামড়া ইতোমধ্যে রপ্তানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ রপ্তানির পরিমাণ দুই কোটি বর্গফুট হতে পারে। এতে করে দেশের চামড়ার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গড়ে তোলা হচ্ছে ৩০০টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন। এগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের চামড়ার তৈরি স্যু, বেল্ট, ব্যাগ, মানিব্যাগ, জ্যাকেট, ট্রাভেলের জন্য সুটকেস ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় বেশি রপ্তানি হচ্ছে।

পাট, চা, চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশ রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করেছিল। চামড়া বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। এ খাতকে রপ্তানিমুখী করতে সরকারের প্রচেষ্টার শেষ নেই। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে এসেছে প্রাকৃতিক চামড়া। ইংরেজিতে বলা হয় আর্টিফিসিয়াল লেদার। পণ্য প্রস্তুত করা হয় মনের মাধুরী মিশিয়ে নানা রং ও ডিজাইনের। দৃষ্টিনন্দন পণ্য তৈরি করে বাজার দখলের চেষ্টা হয়েছে বিভিন্নভাবে। একসময় পণ্য ব্যবহারকারীরা আবার ফিরে গেছেন অরিজিনাল চামড়ার তৈরি পণ্যের দিকে। তাই বিশ্ববাজারে চামড়ার চাহিদা কমেনি। উন্নত দেশে খামার পদ্ধতিতে পশু উৎপাদনের কারণে প্রাকৃতিকভাবে পশু উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় কুলাতে পারেনি। তবে সেক্ষেত্রেও চামড়ার মান নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে। দেখা গেছে বাংলাদেশের চামড়ার মান বেশ উন্নত প্রাকৃতিকভাবেই। যেকোনো শিল্পের টেকসই উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চামড়া শিল্পের বিকাশের জন্য সরকার সাভাবে বড় পরিসরে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। হাজারিবাগের চামড়া ব্যবসায়ীগণ সেখানে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সরিয়ে নিয়েছেন। এখন সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে, কর্মবান্ধব পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছে। দেশে উৎপাদিত চামড়া এখন আর নষ্ট হবার কারণ নেই। পরিবেশ সুরক্ষায় পর্যাপ্ত শোধনাগারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা এখন সেখানে কর্মবান্ধব পরিবেশে আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করছে। ওয়েট ব্লু চামড়ার রপ্তানির দুয়ার খুলে গেছে। আশা করা যায়, এবার কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading