সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ: বিধ্বংসী ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের নেপথ্যের নায়ক
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০৮ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:০৫
ইন্ডিয়ার সেরা অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। ক্রিকেট বিশ্ব তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতি দিয়েছে। জীবনের প্রথম দিন থেকে অসংখ্যবার হারতে হারতে হারের কিনারা থেকে যিনি ফিরে এসেছেন সাফল্যের স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গনে, তিনি হলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তার ৫০তম জন্মদিন আজ। জন্মদিনে ইন্ডিয়ার সেরা অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো সাইফুল ইসলাম।
বুক চিতিয়ে লড়াই করে বারবার রঙ্গমঞ্চে ফিরে আসার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। শুধুমাত্র ব্যাটসম্যান বা বোলার নয়, একজন দক্ষ ক্যাপ্টেন হিসেবেও তার অবদান অনস্বীকার্য। যখন ইন্ডিয়ার ক্রিকেট ইতিহাস রচিত হবে সৌরভকে বাদ দিয়ে কখনই ইন্ডিয়ার ক্রিকেট ইতিহাস লেখা সম্পূর্ণ হতে পারবে না।
সংক্ষেপে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় একজন প্রাক্তন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার এবং ইন্ডিয়ান জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ৮ই জুলাই, ১৯৭২ সালে, কলকাতার বেহালায় একটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারে। তিনি ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) বর্তমান সভাপতি এবং উইসডেন ইন্ডিয়ার সভাপতি। তার বাবার নাম চণ্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় ও মাতার নাম নিরুপা গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভ মূলত তার দাদার সাহায্যে ক্রিকেট জীবনে প্রতিষ্ঠিত হন।
প্রখ্যাত ক্রিকেটীয় পরিবারে শৈশবকাল
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের ৮ই জুলাই শহর কলকাতায়৷ উচ্চবিত্ত পরিবারে পৃথিবীর আলো দেখেছেন সৌরভ। বাড়িতে খেলার বাতাবরণ ছিল। বাবা চন্ডী গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত ক্রিকেট প্রশাসক। দাদা স্নেহাশিষ গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন প্রখ্যাত ক্রিকেটার। ছোটোবেলা থেকেই ক্রিকেটের বাতাবরনে বেড়ে উঠেছেন সৌরভ। ছোটোবেলা থেকেই সৌরভ তাই অনায়াসে ক্রিকেট খেলায় অংশ নিয়েছেন। কৃতি ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করেছেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে।
প্রাক ক্রিকেট জীবন ও লড়াই
১৯৮৯ সালে ইডেনে রনজি ট্রফির ফাইনালে বাংলা চ্যাম্পিয়ান হয়। তার আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। তখন বাংলার অধিনায়ক ছিলেন সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সৌরভকে মিডল অর্ডারে খেলাতে চাইলেন। তুমুল তর্কাতর্কি শুরু হল। বাংলায় তখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানদের ছড়াছড়ি। কাকে বাদ দিয়ে সৌরভকে ঢোকানো হবে? শেষ পর্যন্ত সম্বরণের চাপে সরে যেতে হল সৌরভের বড় দাদা স্নেহাশীসকে। ২২ বলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় করেছিলেন ২৩ রান। ছোট্ট এই ইনিংসের অবদানের কথা হয়তো অনেকে ভুলে গেছেন। কিন্তু ক্রীড়া সমালোচকরা বলে থাকেন, সৌরভ তখন থেকেই জাতীয় নির্বাচকদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন।
পরের গল্পটা সবারই জানা। ২০৬তম ক্রিকেটার হিসাবে টেস্টে আত্মপ্রকাশ করেন লর্ডসে ১৯৯৬ সালের ২০ জুন। এর পূর্বে সৌরভের ওপর অনেক ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে। অন্য কেউ হলে হয়তো খেলার জগতকে বিদায় জানিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতেন। কিন্তু সৌরভের রক্তে ছিল ক্রিকেট, তাই বারবার তিনি খেলার মাঠে ফিরে এসেছেন, অপমানিত হয়েছেন, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করেছেন, হাজার লক্ষ মানুষের সহানুভূতি আদায় করেছেন, জুলে উঠেছেন বীর বিক্রমে। তাই বলা হয় অপরাজেয় পৌরুষের আর একনাম সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পন
১৯৯১-৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাবার সুযোগ পেলেন। এই সফরে গিয়ে সৌরভের অভিজ্ঞতা হল। তিনি বুঝতে পারলেন, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সহখেলোয়াড়রা তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন না। ব্রিসবেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সৌরভকে নেওয়া হল। এই প্রথম বিশ্ব ক্রিকেটের অঙ্গনে তার আত্মপ্রকাশ। ৩ রানে প্যাভিলিয়নে ফিরে এলেন। নির্বাচকরা সতেরো বছরের কিশোরকে সরিয়ে দিলেন।
প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেন লর্ডসে
১৯৯৫ সালে জাতীয় নির্বাচক হলেন সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার অক্লান্ত চেষ্টায় ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে সৌরভের নাম বিবেচিত হল। প্রথম টেস্টে ভারত হেরে গেছে, দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে অনুষ্ঠিত হবে ক্রিকেটের মক্কা লর্ডস শহরে। সমসাময়িক খেলোয়াড় শচীন ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। সৌরভ বোধহয় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। লর্ডসের ২২ গজের মাঠটাকেই বেছে নিলেন নিজেকে প্রকাশ করার মঞ্চ হিসাবে। দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে স্তব্ধ করলেন সমালোচকদের মুখ। পরের টেস্টে আবার শতরান। এরপর থেকেই ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে সৌরভের জয়যাত্রা শুরু। বিশ্বের প্রাক্তন ক্রিকেটার ও বর্তমানে ক্রীড়া ভাষ্যকার জিওফ বয়কট তাকে ডাকতেন প্রিন্স অব ক্যালকাটা নামে।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এর রেকর্ড
টেস্ট ম্যাচের পাশাপাশি একদিনের ক্রিকেটেও সৌরভের আবির্ভাব যথেষ্ট সাড়া জাগাল। সৌরভ এগিয়ে গেলেন ঝড়ের গতিতে। একটির পর একটি সেঞ্চুরি করলেন। শচীনের সঙ্গে পার্টনারশিপকে করে তুললেন সকলের কাছে ঈর্ষণীয়। তখন শচীন ও সৌরভের নাম ক্রিকেট প্রেমিক মানুষের মুখে মুখে। শচীন এবং সৌরভ হয়ে উঠলেন পরস্পরের পরিপূরক। পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে টরেন্টোয় এক ইনিংসে ৫ উইকেট নিলেন মাত্র ১৬ রানে। ১৯৯৬ সালে তৃতীয় ম্যাচে সৌরভকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর একই দেশের বিরুদ্ধে একই জায়গায় চারটি খেলায় ম্যান অব দ্যা ম্যাচের সম্মান পেলেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে সৌরভ মোট ৩৭৯ রান করেছেন।
ইন্ডিয়া ক্রিকেট দলের অধিনায়ক
অধিনায়ক হিসাবেও সৌরভের কৃতিত্ব যথেষ্ট ঈর্ষণীয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সাহারা কাপ জিতলেন ১৯৯৯ সালে। ২০০০ সালে অধিনায়ক হয়ে শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারালেন ৩-২ ম্যাচে। টানা ১৬ টেস্ট জয়ের বিশ্বরেকর্ড করা অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ মার্জিনে পরাজিত করলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর বাদে উপমহাদেশের বাইরে সৌরভের অধিনায়কত্বে ইন্ডিয়া সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল।
বর্তমানে প্রিন্স অব ক্যালকাটা
বর্তমানে তিনি ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) বর্তমান সভাপতি। এছাড়া তাকে ধারা ভাষ্যকার ও প্রশাসকের ভূমিকায়ও দেখা যায়। তিনি টিভিতে ‘দাদাগিরি’ শো’এর উপস্থাপনাও করেন।
ইউডি/অনিক

