চামড়া ব্যবস্থাপনায় সুনজর দিন

চামড়া ব্যবস্থাপনায় সুনজর দিন

নাদের হোসেন ভূঁইয়া । শনিবার, ০৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:১৫

চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য দেশের রপ্তানি পণ্যের একটা বিরাট অংশ দখল করে আছে, যা থেকে আমরা প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি। চামড়া শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। পোশাক শিল্পের পর দেশে চামড়া শিল্পের স্থান। এ শিল্পের ওপর ভর করে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় নয় লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৩০-এর বেশি, যার অধিকাংশ ঢাকায় অবস্থিত। চামড়া শিল্পে প্রধান কাঁচামাল চামড়া। এ চামড়ার একটি বড় অংশ সংগ্রহ হয় কুরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু গত কয়েক মৌসুম ধরে চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যাপক সিন্ডিকেট ও নানা অব্যবস্থাপনায় অনেক নষ্ট হওয়া চামড়া রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে।

সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ১৫৪টি ট্যানারিকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে গ্যাস সংযোগ পেয়ে পূর্ণাঙ্গ চালু হয়েছে ২০টি কারখানা। এর বাইরে আংশিক চালু ৩৫টিসহ অন্তত ৫০টি কারখানা গ্যাস সংযোগের অভাবে পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে পারছে না। আর চালু হওয়া ট্যানারিগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেকটাই বেকায়দায়। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শিল্প এলাকার মধ্যে দূষণ হচ্ছে। দূষণ ধলেশ্বরী নদী ও আশপাশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। কোরবানির সময় যখন বেশি সংখ্যক চামড়া একসঙ্গে আসবে, তখন দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ঈদ এগিয়ে এলেও শিল্প মন্ত্রণালয় এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এর বাইরেও রয়েছে নানান সমস্যা। সাভারে জমির দলিল না পাওয়ায় পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না অনেকেই। এবার কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে তারা অর্থ সংকটে পড়বেন। পাশাপাশি লবণের চড়া দামের কারণে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। গত বছর লবণ সংকটে প্রায় ৩৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়। এবারও লবণ সংকটের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

কোরবানির পশুর চামড়ার জন্য সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এবারও পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে মনে করছেন ট্যানারি মালিকরা। তাঁরা বলছেন, সিইটিপির সার্বিক ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও সব কারখানা একযোগে উৎপাদন শুরু করলে বর্জ্য পরিশোধনের পুরো চাপ নিতে সমস্যা হবে সিইটিপির। কারণ, এর ধারণ ক্ষমতা কম। তা ছাড়া ক্রোমিয়াম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখনও সম্পন্ন হয়নি। কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং করার জন্য হয়নি স্থায়ী কোনো সমাধান। সবমিলিয়ে গত বছরের মতো এবারও এ নিয়ে নানা শঙ্কায় রয়েছে সাভারের ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সিইটিপির ওপর চাপ কমাতে উৎপাদন ক্ষমতা কমালে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, এখন গরম পড়ছে। এতে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়বেন। তবে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু ত্রæটি থাকলেও এবার প্রস্তুতি অনেক বেশি। ইতোমধ্যে সিইটিপি পরিস্কার করা হয়েছে। কঠিন বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য পুকুরও খনন করা হয়েছে। ফলে আগের মতো দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের মাত্রাও কমে যাবে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সিইটিপির বর্জ্য পরিশোধনের ধারণ ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। তবে ট্যানারি মালিকদের অনেকের অনুমান, এটি ১৫ হাজার ঘনমিটারের বেশি নয়। কিন্তু কোরবানির সময় ট্যানারিগুলোর বর্জ্য তৈরি হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার ঘনমিটার। সিইটিপির ধারণক্ষমতা কম। কোরবানির সময় চাপ অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া ক্রোমিয়াম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।

২০১৭ সাল থেকে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে নিয়মিত বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে গিয়ে ৭৯৭.৬১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। যে সম্পদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার কথা, তার এমন অবস্থা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। অন্যান্য শিল্পের মতো যদি চামড়া শিল্পকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলে সম্ভাবনাময় এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। চামড়া শিল্পে অব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক- কলামিস্ট

ইউডি/সিফাত

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading