দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়
মো. শাহাদাত হোসেন । বুধবার, ১৩ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:২০
আমাদের দেশে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু উন্নয়ন আরো টেকসই হতো যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারতাম। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতি মোকাবেলা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সরকার, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান- সবক্ষেত্রেই দুর্নীতির সয়লাব। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ছোট-বড় সামর্থ্য অনুযায়ী সহজেই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ছি। দুর্নীতি আমাদের জন্য অভিশাপ জেনেও লোভ সামলাতে না পেরে আমরা জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছি।
দুর্নীতি বলতে আমরা বুঝি নিয়ম বহির্ভূত ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে বা অর্থের লোভে স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কাজ করা। এটা একটা অপরাধমূলক এবং নীতিবিবর্জিত ঘৃণিত কাজ। আদর্শ ও নৈতিকতা হারিয়ে সামান্য অর্থ কিংবা স্বার্থের লোভে মানুষ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে এক সময় সর্বত্র শোনা যেত জনসংখ্যা উন্নয়নের বাধা। আর এখন শোনা যাচ্ছে, দুর্নীতি জাতীয় উন্নয়নের এক নম্বর শত্রু। বাড়ির ভেতর থেকে শুরু করে চায়ের স্টল, সেমিনার-সভা, বক্তৃতার মঞ্চ ছাড়াও টকশোতে সারাদিন চলছে দুর্নীতির আলোচনা। দুর্নীতিবাজরা সংখ্যায় বেশি না। তারা আমাদের সমাজেরই গুটি কয়েক প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তি।
দুর্নীতি জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায়। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যত বড় এবং সমৃদ্ধ পরিকল্পনা করা হোক না কেন যদি এতে দুর্নীতির সংস্পর্শ থাকে তবে সে উন্নয়ন ফলপ্রসু হয় না। ছোট পরিকল্পনা এবং বাজেট অল্প হলেও একটা কাজ যদি দুর্নীতিমুক্ত হয় তবে তা হবে জননন্দিত এবং ফলপ্রসু। জাতীয় উন্নয়নকে সমৃদ্ধ করতে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সরকার প্রয়োজন। শুধু সরকার কিংবা প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত হলেই আবার হবে না, জনসাধারণকেও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। একটা দেশ বা সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করা অনেক কঠিন, তবে অসম্ভব না। যাদের পূর্বপুরুষ অপকর্ম ও অন্যায়ের সাথে জড়িত তাদের বংশধর ভালো হবে, এটা আশা করা যায় না। যেমন- বাংলাদেশ টানা কয়েকবার দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিলো। আমাদের ধর্মে বলা আছে, দুর্নীতি করা এবং এর প্রশ্রয় দেয়া একটা পাপের কাজ। অথচ আমাদের অনেক ‘ধার্মিক’ ব্যক্তিও বিভিন্নভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত। দুর্নীতি হচ্ছে নিঃশব্দে কুরে খাওয়া ঘুণের মতো। তাই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সৃষ্টির আদিকাল হতেই দুর্নীতি চলে আসছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এটি একটি জটিল ব্যাধি। সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতি দমন করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও মূল্যবোধ সৃষ্টি হলে দুর্নীতি দূর হবে। যেখানেই দুর্নীতি সেখানেই প্রতিরোধ তৈরি করতে হবে। যেখানে দুর্নীতি হয় সেখানে তাদের শাস্তি বিধানের চেয়ে যেন দুর্নীতি না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষা এবং দুর্নীতি করলে কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশকে অতীতের গ্লানি থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
আমাদের রক্তে এবং রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবাহমান। দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করা কঠিন। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নীতি-নৈতিকতা চর্চা করলে সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে। পরিবার থেকে পিতা-মাতা যদি অন্যায় এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে গড়ে উঠতে সন্তানকে পরামর্শ দেন তবে সমাজ সুন্দরভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আবার আইন থাকলে এর প্রয়োগ হচ্ছে ব্যক্তিভেদে। ফলে দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁক দিয়ে সহজেই বের হচ্ছে। সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে।
দুর্নীতির শাস্তি কার্যকর করে ছোট বড় সকলকে আইনের আওতায় আনতে পারলে দুর্নীতি কমে যাবে। অবৈধ অর্থের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে শিশুকাল থেকেই নীতি-নৈতিকতা চর্চা করতে হবে। স্কুলের শিক্ষক যেন অনুকরণীয় হয় সেজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের চরিত্রবানরূপে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হবে।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

