আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে জাতির উন্নয়নে অংশগ্রহণ করি
সুধীরবরণ কর্মকার । সোমবার, ১৮ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
আত্মসম্মানবোধ আজ গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যার আছে সেও হাত পাতে আর যার নাই সেও হাত পাতে। আত্মসম্মানবোধের সংকটের মধ্যদিয়ে একটি জাতি কখনো উন্নতির শিখরে অবস্থান করতে পারে না। আত্মসম্মানবোধ সংকটের মানুষ নিজের সঙ্গে শান্তিতে যেমন থাকতে না পারে তবে অন্যের সঙ্গেও শান্তিতে থাকতে পারে না। আত্মসম্মানবোধের সংকট গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটায়। আত্মসম্মানবোধের সংকট এক সময় নিজের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। আত্মসম্মানবোধহীন মানুষ সব সময়ই মৃত। তারা কখনো জীবনের স্বাদ পায় না। তারা অবৈধভাবে আরও চাই, আরও চাই করতে থাকে। এই চাওয়া-পাওয়া বৈধ-অবৈধ ভেদাভেদ বিচার করে না। এমনিভাবে তারা নিজেদের পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। ভুলে যায় মনুষ্যত্ব, মূল্যবোধ, মানবিকতা।
উন্নত আত্মসম্মানবোধ, সুখী, পরিতপ্ত এবং অভীষ্ট লাভে উদ্যোগী জীবনযাপন সম্ভব করে। নিজের যথার্থ গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে আত্মসম্মানবোধ বাড়ে না। ইতিহাসের মহান বিশ্বনেতা ও আচার্যরাও এই কথাই বলেছেন যে অন্তরের প্রেরণা ছাড়া সফল হওয়া যায় না। উন্নত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা ও দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছাও উন্নত হয়। তারা আশাবাদী, সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখেন এবং পরিপূর্ণ জীবনযাপন করেন। তাদের থাকে কর্মপ্রেরণা ও উচ্চাশা এবং তারা সংবেদনশীলও হয় অনেক বেশি। আত্মসম্মানবোধ কাজকর্মের মানকে উন্নত করে এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। মানুষের ধ্যান-ধারণা ও তার উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ যোগ আছে। যারা নিজের প্রতি ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বাবা-মা, আইন-কানুন ও ধন-সম্পদকে সমীহ করেন এবং নিজের দেশকে ভালোবাসেন তারাই উন্নত আত্মসম্মানবোধের পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আত্মসম্মানবোধ সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিশু যদি কেবল নিন্দা শুনতে শুনতে বড় হয়, তবে সে নিন্দা- মন্দ করতেই শিখবে। আবার যদি প্রশংসা শুনে বড় হয়, তবে প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে শিখবে। যদি সে বেড়ে ওঠে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তবে তার লড়াই করার শক্তি যাবে বেড়ে। আর যদি তার পরিবার হয় সহনশীল, সেও হয়ে উঠবে ধৈর্যশীল।। শৈশব থেকে যদি কেবল উপহাসই পায় তবে সে হবে লাজুক। আর যদি ভালো কাজ পেয়ে থাকে ক্রমাগত উৎসাহ তবে তার আত্মবিশ্বাস যাবে বেড়ে এবং খারাপ কাজের জন্য তিরস্কার পায় বা সমালোচনার স্বীকার হয় তবে সেও আত্মসংযমী হয়ে উঠবে। যদি বড় হয়ে ওঠে লজ্জাজনক আবহাওয়ায় তাহলে সে নিজেকে ভাববে দোষী, আর যদি পায় সবার সমর্থন, তবে সে নিজের উপরেই আস্থা রাখতে পারবে।। শৈশবে যদি সুবিচার পায়, তবে সে ন্যায়-বিচার করতে শিখবে। নিরাপত্তার মধ্যে বাস করলে, সে শিখবে বিশ্বাস করতে। শিশু যদি পায় বন্ধুত্ব ও স্বীকৃতি, তবে সে পৃথিবীতে ভালোবাসার সন্ধান করবে। শিশুদের শিখাতে হবে নিজের জন্য বা নিজ পরিবারের জন্য হাতপাতার মধ্যে কোনো গৌরব নেই, কোনো সম্মান নেই, আছে শুধু হীনম্মন্যতা, লজ্জা আর লজ্জা। আত্মসম্মানবোধের মধ্যদিয়ে দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করা যায়। আত্মসম্মানবোধ মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আমাদের সমাজে প্রাচীন কিছু নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে, যা বাঙালিরা তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে গ্রহণ করেছে, যেমন- সত্যবাদিতা, অহিংসা, শান্তি, ক্ষমা, অধ্যবসায়, সরলতা, জ্ঞানের তৃষ্ণা, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং শ্রদ্ধা। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে নৈতিক মূল্যবোধ শেখায়।
যে জাতি বুকের রক্ত দিয়ে আমার স্বাধীনতা এনে দিতে পারে, আমাকে শত্রম্নমুক্ত করতে পারে সেই জাতির কখনো আত্মসম্মানবোধের সংকট থাকতে পারে না। তারা কখনোই ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, মাদক কারবার, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, বলাৎকার, বিদেশে টাকা পাচার এবং দেশের সাধারণ মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করে হাতপাতা জাতিতে পরিণত করা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। পারিবারিক শিক্ষা আত্মসম্মানবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আজকের আধুনিক বিশ্বসভ্যতার সময়ে আমাদের আত্মসম্মানবোধের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পারিবারিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় দায়বদ্ধতার শিক্ষার ব্যাপক প্রচলনের মধ্যদিয়ে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আত্মসম্মানবোধের ব্যাপক প্রসার এবং জাগরণ ঘটানো সম্ভব। মনে রাখা দরকার আত্মসম্মানবোধ না থাকলে এক জাতি কখনোই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, ভাষা এবং ঐতিহ্যগত দিক থেকে কখনোই উন্নতির শিকরে আরোহণ করতে পারে না। আর একটি জাতি হিসেবে তা আমাদের কখনোই কাম্য হতে পারে না। দেশপ্রেমের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ নিহিত থাকে। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে কখনোই হাতপাতা, ঘুষ, চুরি, দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচার, মানব পাচার, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অন্যায়, অপকর্ম করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের ব্যক্তি, দেশ, জাতির লক্ষ্যে এবং আমাকে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উৎকৃষ্ট আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আসুন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠি এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ করি।
লেখক- শিক্ষক
ইউডি/অনিক

