ফুটপাতের অস্বাস্থ্যকর খাবার বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বদিউজ্জামান রাসেল । মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৯:৩৫
শহরের অধিকাংশ হোটেল বা রেস্তোরাঁর রান্না ফুটপাতেই হয়ে থাকে। বিশেষ করে ছোট ছোট হোটেল এবং ভ্রাম্যমাণ হোটেলের রান্না। জ্বলন্ত চুলা ফুটপাতে রেখে মুখরোচক খাবার পুরি, সিঙ্গাড়া, সমুচা, পেঁয়াজু, পরোটা, রুটি ইত্যাদি ভাজা হচ্ছে। পাশ দিয়েই পথচারী হেঁটে যাচ্ছে। ফুটন্ত তেল যে কোনো মুহূর্তে চলাচলকারীর ওপর পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। ভাসমান হোটেল, রেস্তোরাঁ শহরের যেসব এলাকায় লোক সমাগম বেশি, সেসব এলাকাতেই বেশি দেখা যায়। যেমন মতিঝিল, পল্টন, মহাখালী, মগবাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, শ্যামলী ইত্যাদি। ফুটপাতে চুলা জ্বালিয়ে খাবার তৈরির রমরমা ব্যবসা পুরান ঢাকার অলিগলিতে চলছে। ফুটপাত দখল করে, চুলা জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ কিছু করছে না। আর করবেই বা কে? যাদের করার কথা তারাই তো এসব ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদা তুলছে।
এলাকাভেদে এসব ভাসমান দোকানের চাঁদা একেক রকম। পাঁচ শ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব ভাজা খাবার স্বাস্হ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। তবুও নিম্ন আয়ের মানুষ খাচ্ছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী। সেখানেও ভ্রাম্যমাণ দোকানে ভরপুর। বিশেষ করে দুপুরবেলায় এসব ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান দেখা যায় বেশি। এছাড়াও শুক্রবার বনানীর রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ খাবার দোকানের ছড়াছড়ি থাকে। এখানে যে শুধু নিম্ন আয়ের লোকজনই খাওয়াদাওয়া করে তা নয়। বিভিন্ন ইউনির্ভাসিটির ছাত্রছাত্রীরাও খেয়ে থাকে। তাদের বসে খাওয়ার ব্যবস্হা নাই। দাঁড়িয়েই সবাই খাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা ভ্যানে অথবা টং দোকানে খাবার বিক্রি করছে। মানুষও খাচ্ছে।
গ্রামগঞ্জ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা কোনো রকমে তাদের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাইভেট ভার্সিটিতে প্রফেশনাল কোর্স করে থাকেন। যেমন এমবিএ, এমবিএম, বিবিএ ইত্যাদি। তাঁরা ছোটখাটো চাকরি করেন আর সপ্তাহে শুক্রবার এসব ভার্সিটিতে বিভিন্ন কোর্স। তাঁদের সাধ্য নাই যে, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় হোটেলে বা রেস্তোরাঁয় গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার। তাই বাধ্য হয়েই ফুটপাতের খাবার, রিকশাওয়ালা, দিনমুজুর ও ভাসমান মানুষদের সঙ্গে খেতে হয়। এছাড়া যে এলাকায় অফিস বেশি, সেসব এলাকায়ও ভ্রামামাণ খাবারের দোকান বেশি। কারণ সেইসব এলাকার অফিসের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীর দুপুরের খাবারের একমাত্র ভরসা এসব খাবারের দোকান। দোকানিরা রান্না করা খাবার ভ্যানে করে নিয়ে আসে দুপুরবেলায়। এখানে যারা খাচ্ছে তারা বাধ্য হয়েই নোংরা পরিবেশে অস্বাস্হ্যকর খাবার খাচ্ছে। মুখরোচক আর সস্তা হওয়ায়, বেশ জনপ্রিয় ফুটপাতের খাবার। কিন্তু কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বলছে এসব খাবার বিষে ভরা। গবেষণা তথ্য মতে, ফুটপাতের শতভাগ খাবারে আছে মলের জীবাণু। তবে এমন অভিযোগে দোকান বন্ধ করে না দিয়ে, বরং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের। পথে-ঘাটে বানানো আর কেনাবেচা হওয়ায় এসব খাবার কতটুকু নিরাপদ সেই বিষয়ে জানতে গবেষণা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। এ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হাতিরঝিল, ধানমন্ডিসহ ১৫টি স্পট। যেখানে ১৩টি খাদ্যের ১৫০ নমুনা করা হয় নিরীক্ষা।
গবেষণা বলছে, আখসহ বিভিন্ন ফলের রস, ভেলপুরি, পানিপুরি, ঝালমুড়ি, নুডলস ও জাম্বুরা মাখার শতবাগ নমুনায় মলের জীবাণু কলিফর্ম ও ইকোলাই আছে ক্ষতিকর মাত্রার অনেক ওপরেই। তবে লেবুর রস ও তেঁতুল পানিতে তা ছিল সহনীয় মাত্রায়। উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফুটপাতের খাবারে জীবাণু মিলেছে এমন অভিযোগে দোকান বন্ধ না করে, বরং প্রশিক্ষণ দিতে হবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। মেডিকেল সায়েন্সের আর্টিকেল সমৃদ্ধ পাবমেডে বাংলাদেশকে নিয়ে এক আর্টিকেলের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন। আর এর প্রধাণ কারণ দেখানো হয়েছে, স্ট্রিটফুড বা ফুটপাতের অস্বাস্থ্যকর খাবার। খাবার যেমিন আমাদের জীবন বাঁচায়, আবার সেই খাবারই আমাদের জীবন কেড়ে নিতে পারে। আর প্রশাসনের উচিত ফুটপাতে কোনো রকমের খাবার তৈরি হবে না মর্মে নোটিশ জারি করা- ফুটপাতে কোনো ধরনের চুলা জ্বলবে না। কেউ ফুটপাতে চুলা জ্বালালে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। ফুটপাতের খাবারের প্রভাবে আমাদের শরীরে নানা ধরনের রোগব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে সবার সচেতন হওয়া উচিত।
লেখক : কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

