পদ্মাসেতুর সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতনতা কাম্য
নাদের হোসেন ভূঁইয়া । মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
স্বপ্নের পদ্মাসেতু এখন বাস্তব। আমাদের পদ্মাসেতু দেশে বিদেশে একটি আলোচিত ইস্যু। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পদ্মা সেতু অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে। দেশের এত বড় একটি মেগা প্রজেক্টের বাস্তবায়ন মানে বিশাল এক অর্জন এবং এ সেতুর সাথে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ জড়িত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় মনোবল ও সাহসী নেতৃত্বের সোনালি ফসল পদ্মা সেতু। দেশের আরো অনেক মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে, কিন্তু পদ্মাসেতুর বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। শুরুতেই নানা মহল থেকে পদ্মা সেতু নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক তার সাথে করা ঋণচুক্তি বাতিল করে। দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। এমন এক পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন।
২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১২ সালের ৪ জুলাই সংসদে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নদী নির্ভর আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বহু বছর ধরে। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সড়ক যোগাযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক্ষেত্রেও বাধা ছিল অসংখ্য নদ-নদী। যে কোনো সড়ক তৈরি করতে গেলেই এখানে ছোট-বড় নদী অতিক্রম করতে হয়। এক সময় অনেক ফেরি চালু ছিল। পদ্মার ফেরির সাথে আছে মানুষের অনেক দুঃখ-বেদনার ইতিহাস। বহু প্রতীক্ষিত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সুবিধার জন্যই স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ৭ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮ দশমিক ১০ মিটার। দ্বিতল এই সেতুর এক অংশ মুন্সিগঞ্জের মাওয়া এবং অপর অংশ শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে যুক্ত। নির্মাণে মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সেতুর নির্মাণ কাজে মোট জনবল ছিল প্রায় ৪০০০। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৯১৮ হেক্টর। অনেক চিন্তা ভাবনা করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।
সকল জল্পনাকল্পনা আর আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে গত ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয় দক্ষিণাঞ্চল তথা সারা বাংলাদেশের মানুষের গর্ব ও সফলতার প্রতীক পদ্মাসেতু। শত বাধা আর হাজারো দেশ-বিদেশি ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত অতিক্রম করে, দেশের নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর কাজ সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। এই পদ্মাসেতুর ফলে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের মাঝে দূরত্ব অনেক কমে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রথম দিনই সেতুতে চলছে নিয়ম ভাঙার মহাউৎসব। সেতুতে প্রবেশ করার পর কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে তুলছেন ছবি আবার কেউ সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে করছেন টিকটক ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এমনই একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সেতুর রেলিংয়ের নাট খুলে টিকটক করেছেন এক যুবক। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, গোটা বিশ্ব যেখানে বাংলাদেশকে বাহবা দিচ্ছে সেখানে ওই ব্যক্তি সেতুর ২টি নাট খুলে সেতু পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কাউকে দেখা যাচ্ছে সেতুর মাঝে প্রকৃতির ডাক সারানোর কাজ করছে। অথচ সেতু কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে সবাইকে বলা হয়েছে, পদ্মাসেতুর ওপর যেকোনো ধরনের যানবাহন দাঁড়ানো ও যানবাহন থেকে নেমে সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা বা হাঁটা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু নিয়ম মানার ব্যাপারে সবাই উদাসীন। যদিও প্রশাসন ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু, দিন শেষে জনগণের সহায়তা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সেতুটি আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির পাশাপাশি সফলতা ও গর্বের প্রতীক। এর সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা বজায় রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। পাশাপাশি সেতু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

