মাঙ্কিপক্সের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি
আনোয়ার মোহম্মদ শামীম । মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৯:৫৫
করোনার আতঙ্ক কিছুটা কমতে না কমতেই নতুন উপদ্রব হিসেবে দুনিয়া জুড়ে হাজির হয়েছে মাঙ্কিপক্স। আফ্রিকার স্থানীয় ভাইরাসটি এরই মধ্যে ইউরোপ-আমেরিকায় শনাক্ত হয়েছে। ২০২২ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিরল রোগ মাঙ্কিপক্সে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ জনের বেশি; আর এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে দেড় হাজারের ওপরে। আফ্রিকা মহাদেশের শীর্ষ স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টারস ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানা যায়।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইসরাইল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরেও চিহ্নিত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ আক্রান্ত হয়েছেন ভারতের এক ব্যক্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা প্রতিটি দেশকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই অবাধ যোগাযোগব্যবস্থার যুগে ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের সুযোগ অনেক বেশি। প্রাণী থেকে মানুষে, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় এটি। ফলে আক্রান্ত কোনো দেশ বা অঞ্চলে যাতায়াতের মাধ্যমে বিপুল আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাঙ্কিপক্স প্রতিরোধ-প্রতিকারের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য নির্দেশনা জানা এবং মেনে চলা জরুরি।
মাঙ্কিপক্স পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার বৃষ্টিপ্রধান বনাঞ্চলে বানরের দেহে প্রথম ধরা পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। ১৯৭০ সালে কঙ্গোতে প্রথম বারের মতো মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। মাঙ্কিপক্স মূলত একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। স্মলপক্স ভাইরাস শ্রেণির একটি ভাইরাস এই রোগের জন্য দায়ী। প্রধানত বানরের মাধ্যমে ছড়ালেও আরো কয়েকটি প্রাণীকে এর বাহক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। ইঁদুর ও কাঠবিড়ালির মতো প্রাণী এবং আমদানি করা পশুর মাধ্যমে এর সংক্রমণ ঘটতে পারে। সংক্রমিত মানুষের দেহ থেকেও এর বিস্তার ঘটে। তবে এটি কোভিড-১৯-এর মতো অতটা ছোঁয়াচে নয়। বায়ুবাহিত এই ভাইরাস প্রায় চার সপ্তাহ পর্যন্ত বাতাসে টিকে থাকতে সক্ষম।
শ্বাসতন্ত্র, ত্বকের ক্ষত ও মিউকাস মেমব্রেনের মাধ্যমে এই ভাইরাস মানবশরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত পশুর আঁচড় বা কামড়, সংক্রমিত ব্যক্তি বা বস্তুর সংস্পর্শ, অরক্ষিত যৌনমিলন, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির তরলকণা (ড্রপলেট)-এসবের মাধ্যমে সাধারণত মাঙ্কিপক্সের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংক্রমণ ঘটে থাকে। মাঙ্কিপক্স ভাইরাস দেহে প্রবেশের পর সাধারণত ৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, লক্ষণগুলো দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রাথমিকভাবে জ্বর, ঠান্ডা ও মাথাব্যথা, মুখ, হাত, পা, চোখ, যৌনাঙ্গ প্রভৃতি স্থানে ফুসকুড়ি ওঠা এবং ফুসকুড়িতে ব্যথা হওয়া, লিম্ফনোডে প্রদাহ এবং লিম্ফনোড ফুলে যাওয়া, রং পরিবর্তনের পাশাপাশি চামড়ায় ফোসকার মতো হওয়া এবং চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া, মাংসপেশিতে ব্যথা, শারীরিক অবসাদ প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়।
শিশু ও যাদের দেহে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। করোনা ভাইরাসের মতো এর প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রেও কতকগুলো নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেমন- বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন, অরক্ষিত যৌনমিলন করবেন না, ভাইরাসে আক্রান্ত পশুর কাছাকাছি যাবেন না, মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাবেন, সর্বোপরি হাত ধোয়া, নাকে-মুখে হাত না দেওয়া, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার প্রভৃতি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে এমনিতেই এই রোগ ভালো হয়ে যায়। মূলত মাঙ্কিপক্স, গুটিবসন্ত ও ভ্যাক্সিনিয়া- এগুলো সব একই গ্রুপের ভাইরাস। সফলভাবে গুটিবসন্তের টিকাদানের ফলে ১৯৮০ সালে গুটিবসন্ত নির্মূল হয়েছে। এই গুটিবসন্তের টিকা মাঙ্কিপক্সের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয় বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
গুটিবসন্তের প্রথম প্রজন্মের ভ্যাকসিন আর নেই, তবে ভ্যাক্সিনিয়া ভাইরাসের ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে; যা গুটিবসন্ত ও মাঙ্কিপক্স দুটির বিরুদ্ধেই কার্যকর। এমতাবস্থায়, গুটিবসন্তের নতুন কয়েকটি টিকা মাঙ্কিপক্সের বেলায় সুরক্ষা দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন। তবে ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শরীরে সংক্রমণের কোনোরূপ লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রাথমিক যত্নের পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
লেখক: গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

