ই-টেন্ডারিং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বিরাজ হতাশাজনক
হাসনাত করিম । বুধবার, ২০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১২:১০
ই-টেন্ডারিং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বিরাজ করার বিষয়টি হতাশাজনক। সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৩ ধরনের দুর্বল দিক। শুধু তাই নয়, তদারকি ভালো না হলে এক্ষেত্রে অপচয়ের শঙ্কাসহ ৮ ধরনের ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। প্রকল্পটিতে ইতোমধ্যে ২২টি অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৬টির। যদিও প্রকল্পের গতি বৃদ্ধিতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ, তবে তা কতটা কার্যকর হবে, এটাই প্রশ্ন।
সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে ই-টেন্ডারিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, বর্তমানে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। দেখা গেছে, করোনা মহামারির সময়েও এ সিস্টেম সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘণ্টাই কাজ করেছে। এছাড়াও এ প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। একইসঙ্গে ক্রয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং ক্রয়কারী ও দরদাতার আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের ‘ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড’ লাভসহ আইএসও সনদ পেয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক প্রযুক্তির এ প্রকল্পটিতে ধীরগতিসহ সব দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বলার অপেক্ষা রাখে না, যে কোনো প্রযুক্তি সহজলভ্য করার পাশাপাশি এর সহজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ব।
একটি দরপত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পাঁচটি ধাপ পেরোতে হয়। ই-টেন্ডারের ক্ষেত্রে মাত্র দুটি বিষয় অর্থাৎ দরপত্র আহ্বান ও জমার কাজটি হয় অনলাইনে। দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ দেওয়া ও চুক্তি- এ কাজগুলো দরপত্র আহ্বানকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থা ম্যানুয়ালি করে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, যে ঠিকাদার সর্বনিম্ন দর দেবেন, যাচাই-বাছাই শেষে তাঁকেই কার্যাদেশ দেওয়ার কথা।
কিন্তু ই-টেন্ডারে সব ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক সময় দরপত্র আহ্বানকারী সংস্থা জমা পড়া দরপত্রের সব তথ্য পছন্দের ঠিকাদারকে জানিয়ে দেয়। ওই ঠিকাদার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সব তথ্য জেনে নিয়ে সবার শেষে নিজের দরপত্র জমা দেন। এতে তাঁর কাজ পেতেও সুবিধা হয়। অর্থাৎ নামে অনলাইন হলেও বাস্তবে ম্যানুয়াল পদ্ধতির সব তথ্যই চলে যায় দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের কাছে। আবার দরপত্র আহ্বানের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রভাবশালীদের জানিয়ে দেয় যে কারা কারা শিডিউল কিনেছে। তখন প্রভাবশালীরা ওই ঠিকদারদের শিডিউল জমা দিতে বাধা দেয় এবং নিজেরা কাজ বাগিয়ে নেয়। একটি অসাধু চক্র এ কাজে জড়িত। টেন্ডারবাজি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে ই-টেন্ডার করা হলেও সিন্ডিকেট টেন্ডারবাজদের থামানো যাচ্ছে না।
অথচ দরপত্র আহ্বান ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি-অনিয়ম ঠেকাতে সরকার উন্নয়নকাজে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া যুক্ত করেছিল কয়েক বছর আগে। কিন্তু ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি তো কমেইনি, বরং অসাধু চক্রের তৎপরতায় এক ঠিকাদারের দরপত্রের তথ্য চলে যাচ্ছে আরেক ঠিকাদারের হাতে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী আগে ক্রয়ের জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সরকারি আরো তিনটি সংস্থার কর্মকর্তারা দরপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে দরপত্রের মূল্যায়নের সময় পছন্দের লোককে কাজ দিতে চাইলে একক কোনো কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আর বর্তমানে ই-টেন্ডারের ক্ষেত্রে দরপত্র খোলার জন্য দুই সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। তাদের একজন ক্রয়কারী কর্মকর্তা, অন্যজন ক্রয়কারী কর্মকর্তার দপ্তরের একজন। ফলে একজন ক্রয়কারী তাঁর ইচ্ছামাফিক মূল্যায়নের পর্যায়ে কাজ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেন। ঢাকা ওয়াসার একজন তালিকাভুক্ত ঠিকাদার কালের বলেন, দুর্নীতি কমাতে ই-টেন্ডার চালু করা হয়েছে, কিন্তু সেই দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। প্রকৌশলীদের চাহিদামাফিক অর্থ না দিলে কাগজপত্র ঠিক না থাকার অভিযোগ তুলে দরপত্র অযোগ্য করে দেওয়া হয়। নানা অজুহাত খুঁজে বের করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে প্রকৌশলীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ নিতে হয়।
দেশে প্রচলিত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের অসংগতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা সর্বজনবিদিত। টেন্ডারবাজদের অপতৎপরতা ও সহিংস আচরণের খবর মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নানারকম অবৈধ পন্থা অবলম্বন ছাড়াও সশস্ত্র টেন্ডারবাজরা কার্যাদেশ হাতিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে অনেক সময় খুন-খারাবির ঘটনা পর্যন্ত ঘটায়। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে ই-টেন্ডারিং পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম, তা বলাই বাহুল্য। অনলাইন বা ই-টেন্ডারিং পদ্ধতিতে ঘরে বসেই দরপত্র সংক্রান্ত সব কাজ করা সম্ভব। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দরপত্রের প্রস্তাব, মূল্যায়ন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং ই-পেমেন্টসহ সংশ্লিষ্ট অনেক কাজই স্বল্প সময়ে, সহজে ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব। দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি কাজের সঠিক মান বজায় রাখতে ই-টেন্ডারিং পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করি আমরা। অবশ্য এ কথাও সত্য, শুধু পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হলেই চলবে না, নাগরিকদের মধ্যে দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও লুটপাট থেকে দূরে থাকার মানসিকতা তৈরির উদ্যোগও নিতে হবে। সব ধরনের শৈথিল্য ও অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে যথাসময়ে সঠিকভাবে ই-টেন্ডারিং প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক
ইউডি/অনিক

