সাবরিনা-আরিফরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২০ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১১:৫৫
করোনা ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরী ও চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীসহ আট আসামিকে দণ্ডবিধির পৃথক তিন ধারায় ১১ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেনের আদালত এ আদেশ দেন। আদালত বলেছেন, সাবরিনা-আরিফরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে। বিস্তারিত লিখেছেন মো. রুবেল
দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ২০২০ সালের মার্চে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়েছিল ওভাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথকেয়ার। কিন্তু জুনের শেষ দিকে অভিযোগ আসে, সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও হেলথকেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নিচ্ছিল জেকেজি। এছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করেই ২৭ হাজার মানুষকে রিপোর্ট দেন ডা. সাবরিনা ও তার স্বামীর প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ার। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী একজন তেজগাঁও থানায় মামলা করে। এরপর গত ২৩ জুন আরিফুল হক চৌধুরীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২০ সালের ১২ জুলাই ডা. সাবরিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে শফিকুল ও জেবুন্নেসা রিমাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। ২০২০ সালের ২৩ জুন অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ২০ আগস্ট সাবরিনাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত।

৮ আসামির ১১ বছর করে সাজা: ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লা আবু জানান, মামলাটিতে প্রত্যেক আসামিকে দণ্ডবিধির ৪০৩ ধারায় তিন বছর, ৪৬৬ ধারায় চার বছর ও ৪৭১ ধারায় চার বছর; সর্বমোট ১১ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এসব দণ্ড একটি শেষ হলে পরবর্তীটি কার্যকর হবে বলে আদেশে বলা হয়েছে। আলোচিত এই মামলায় রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় কারাগার থেকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় আসামিদের। এরপর তাদের আদালতের হাজত খানায় রাখা হয়। সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফুল ছাড়া মামলার বাকি ছয় আসামি হলেন- আরিফুলের বোন জেবুন্নেছা রিমা, সাবেক কর্মচারী হুমায়ুন কবির হিমু ও তার স্ত্রী তানজিলা পাটোয়ারী, জেকেজির কোঅর্ডিনেটর আবু সাঈদ চৌধুরী, জেকেজির কর্মচারী বিপুল দাস ও শফিকুল ইসলাম রোমিও। এর আগে, গত ২৯ জুন ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেনের আদালত উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য ১৯ জুলাই দিন ধার্য করেন। মামলায় কারাদøপ্রাপ্ত অপর আসামিরা হলেন আবু সাঈদ চৌধুরী, হিমু, তানজিলা, বিপুল, শফিকুল ইসলাম রোমিও ও জেবুন্নেসা। মামলাটিতে মোট ৪০ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

সাবরিনা-আরিফরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে: জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা ও সিইও আরিফুল হক চৌধুরীসহ অন্য আসামিরা করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। মামলাটিতে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এজন্য তাদের সাজা পাওয়া উচিত। মঙ্গলবার (১৯ জুলাই) দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু রায় ঘোষণা শেষে সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন- এই আসামিরা করোনা মহামারিতে মানুষের জীবন নিয়ে খেলেছেন। তারা কখনও অনুকম্পা পেতে পারে না। তাই তাদের আদালত সাজা দিয়েছেন।

‘একদিন প্রমাণ হবে আমি নির্দোষ ছিলাম’: রায় শেষে সাবরিনাকে আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় তাঁর এক আইনজীবী বলেন, বের হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। সে সময় সাবরিনা আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বলেন, আমি তো সেদিনই মরে গেছি। যেদিন আমাকে এখানে ঢোকানো হয়েছে। আমি বের হবো কি না সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো দেশবাসী জানলো আমি অপরাধী। এরপরে সাবরিনা বলেন, একদিন প্রমাণ হবে সাবরিনা নির্দোষ। আমি নির্দোষ কিন্তু দেশবাসী জানলো আমি অপরাধী। শুধু বলব, আল্লাহ একদিন এর বিচার করবেন।
কে এই ডা. সাবরিনা: দণ্ডপ্রাপ্ত জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরী ছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক। তার স্বামীর নাম আরিফ চৌধুরী। এই দম্পতির জীবনও রূপকথার মতো। আরিফের চতুর্থ স্ত্রী সাবরিনা। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মূলত সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি ভাগিয়ে নেয় অনেকটা অখ্যাত জেকেজি নামে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে রাজধানীর তিতুমীর কলেজে মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি মিললেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকা আর অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তারা। স্বামী-স্ত্রী মিলে করোনা টেস্ট করলেও তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। স্ত্রীর সঙ্গে অশালীন অবস্থায় দেখতে পেয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক চিকিৎসককে মারধর করেন আরিফ চৌধুরী। পরে এ ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করেন ডা. সাবরিনা। এ ছাড়া জেকেজির এক কর্মীকে অশালীন প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনায় গুলশান থানার আরিফ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

নজর ছিল করোনা তহবিলের দিকেও: করোনা নমুনা সংগ্রহের বৈধ অনুমতি পাওয়ার পরও টাকার লোভে ভুয়া টেস্ট শুরু করেছিল জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে চলেছিল এমন অপকর্ম। এমনকি সরকারের করোনা ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকার দিকেও চোখ পড়ে এ দম্পতির। সেখান থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চার কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ও করেছিলেন তারা।
অভিযোগপত্রে যা বলা আছে: তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, মামলার এজাহারনামীয় গ্রেপ্তার ৯ নং আসামি ও এদের মধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া তিন আসামির জবানবন্দির কপিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডকুমেন্টারি দালিলিক কাগজপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, জেকেজি হেলথ কেয়ার একটি নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। যার আছে শুধু সিটি করপোরেশন কর্তৃক ২০২০ সালের ১৬ জুন প্রাপ্ত ট্রেড লাইসেন্স। অথচ জেকেজি হেলথ কেয়ার প্রতিষ্ঠানটি তার দুই মাস আগে অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমতি পেয়ে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ৮টি বুথ স্থাপন করে করোনা উপসর্গ রোগীদের স্যাম্পল কালেকশন শুরু করে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় প্রকাশ পায়।অভিযোগপত্রে বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে তদন্তের জন্য মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি গিয়ে এডিজির (প্রশাসন) সঙ্গে আলোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, জেকেজি হেলথ কেয়ার সংক্রান্ত সব ধরনের কাগজপত্র সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের নির্দেশে তিনি স্বাক্ষর করেছেন। বিষয়টি তদন্তকালে জানা যায়, সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদ অবৈধ ও বেআইনিভাবে নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান জেকেজিকে করোনার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি প্রদান করেন। তদন্তকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এডিজির লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী জেকেজি হেলথ কেয়ার কোনোভাবে স্যাম্পল কালেকশন বাবদ টাকা গ্রহণ এবং স্যাম্পল দাতাদের রিপোর্ট ও সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারবে না বলে শর্ত থাকলেও জেকেজি হেলথ কেয়ার অবৈধ পন্থায় স্যাম্পল গ্রহণ ও টাকা সংগ্রহ করেছে বিধায় আসামিদের প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী কোনো স্যাম্পল পরীক্ষার অনুমতি না থাকলেও জেকেজি হেলথ কেয়ার ‘আইদেশি’র মাধ্যমে স্যাম্পল পরীক্ষা করে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া ‘আইদেশি’র কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারি, জেকেজি হেলথকেয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্দিষ্ট বুথের বাইরে গিয়ে প্রতারণার উদ্দেশে স্যাম্পল সংগ্রহ করেছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, রোগীদের স্বীকারোক্তি এবং ওভালগ্রুপের আরিফুল চৌধুরী ও ডা. সাবরিনা শারমিন হোসাইনদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের মে থেকে জুন মাসে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা লেনদেন হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, করোনাকালীন তারা টাকার বিনিময়ে করোনা স্যাম্পল সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করে সরকারি লোগো ব্যবহার করে জাল সার্টিফিকেট প্রদান করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করেছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তিনি প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এছাড়া, তদন্তকালে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া যায়, সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদ অবৈধ সুবিধা প্রাপ্তির শর্তে জেকেজিকে কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে অবৈধ সুবিধা দিয়ে আসছিলেন।
২০২০ সালের ২৩ জুন সাবরীনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। এ ছাড়া ২০২০ সালের ১২ জুলাই দুপুরে ডা. সাবরীনাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগীয় উপকমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে তেজগাঁও থানায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
ইউডি/সুপ্ত

