জীবনযাত্রার ব্যয়: অস্তিত্বের স্বার্থে ঠেকাতে হবে মূল্যস্ফীতি
মানিক মুনতাসির । বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৭:৫৫
করোনা মহামারি থেমে যাওয়ার পর বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে- প্রায় দেড় বছর আগে এমন আশঙ্কা থেকে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা এফএও। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ওই সতর্কতা যেসব দেশ আমলে নিয়েছিল সেসব দেশে খাদ্য সংকট নেই। তবে খাদ্যপণ্যের দাম বেশ চড়া। এ ছাড়া মহামারি শেষ হলে বা করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল এফএও। সে সময় অবশ্য আপৎকালীন তহবিল হিসেবে বহু দেশ খাদ্য মজুদ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশও আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করে খাদ্যের মজুদ বাড়ায়। বর্তমানে সরকারের হাতে ১৬ লাখ টনের বেশি খাদ্যপণ্য মজুদ রয়েছে। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষকে নানাভাবে খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে সরকার। তবু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি পুরোপুরি।
এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে ঘি ঢেলেছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে দফায় দফায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রভাবটা একটু বেশিই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর অন্যতম কারণ মনিটরিং না থাকা। এখানে বাজারে যে-যার মতো দাম বাড়ায়। কোনো জবাবদিহি নেই। কেউ কারসাজি করলেও শাস্তি হয় না। ফলে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ালেও এর কোনো প্রতিকার হয় না বলে মনে করেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। করোনা মহামারির বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বিশ্ব। বারবার কভিডের প্রাদুর্ভাব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় চলতি বছর সামাজিক অস্থিরতার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। ১৩২টি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ছয় মাসের নাগরিক অস্থিরতা সূচক (সিভিল আনরেস্ট ইনডেক্স) প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক ঝুঁকি ও কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে বিশ্বের সব দেশের সরকারের ওপরই চাপ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যম আয়ের দেশগুলো উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সূচকে উচ্চ ঝুঁকি বা চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই বিশ্বব্যাংকের নিম্নমধ্যম বা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের তালিকাভুক্ত। এ ক্ষেত্রে যে ১০টি দেশকে আলাদাভাবে নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মিসর, তিউনিসিয়া, লেবানন, সেনেগাল, কেনিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন। প্রতিবেদনে বলা হয়, মহামারির সময়ে এ দেশগুলো তাদের জনগণের সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা এখন হিমশিম খাচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। বাড়ছে জ্বালানির দামও। এতে সবচেয়ে বিপাকে পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলো।
যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ায় ওই দুটি দেশ থেকে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ। দেড় বছর আগে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ওই সতর্কতা যেসব দেশ আমলে নিয়েছিল সেসব দেশে খাদ্য সংকট নেই। তবে খাদ্যপণ্যের দাম বেশ চড়া। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক সংকটের অগ্নিতে ঘি ঢেলেছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে দফায় দফায়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রভাবটা একটু বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর অন্যতম কারণ মনিটরিং না থাকা। এখানে বাজারে যে-যার মতো দাম বাড়ায়। কোনো জবাবদিহি নেই। কেউ কারসাজি করলেও শাস্তি হয় না। যা মুনাফাখোরদের জন্য মহাসুযোগ সৃষ্টি করছে। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ছে দুর্ভোগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। স্বল্প আয়ের মানুষকে যা দিশাহারা অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই ঠেকাতে হবে মূল্যস্ফীতি।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

