মৎস্য খাত: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক

মৎস্য খাত: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক

মনিরুল হক রনি । শুক্রবার, ২২ জুলাই ২০২২ । আপডেট ০৯:৪৫

ভাত ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা অভাব্য। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, তেমনি মাছ উৎপাদনেও রেখেছে সাফল্যের সাক্ষর। তার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড একুয়াকালচার ২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। প্রতি দুই বছর পরপর করা এই প্রতিবেদন বলছে, নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা স্বত্ত্বেও চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের তিনটি দেশ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অন্য দুটি ভিয়েতনাম ও মিসর। প্রতিবেদন অনুযায়ী স্বাদুপানির পাখনাযুক্ত (ফিনফিশ) মাছ যেমন- রুই, কাতলা, পাঙাশ, তেলাপিয়া, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প ইত্যাদি মাছ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর সামগ্রিকভাবে স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে ভারত ও চীনের পর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। চাষের মাছ উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

মাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। জিডিপিতেও আছে মৎস্য খাতের অসামান্য অবদান। বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)-এর তথ্যানুযায়ী, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান তিন দশমিক ৫০ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত এক দশকে মৎস্য খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ছয় দশমিক ২৮ শতাংশ। বলা হচ্ছে, মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪১ সালে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়াবে ৯০ লাখ মেট্রিক টন। এ ছাড়া কর্মসংস্থান তৈরিতেও মৎস্য খাতের গুরুত্ব দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিগত দুই বছর করোনার মধ্যে অন্যান্য খাতে কর্মী ছাঁটাই হলেও মৎস্য খাত ছিল ব্যতিক্রম। এ খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় মৎস্য খাত এখন সম্ভাবনাময় একটি নাম।

তবে এ খাতে সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি আছে নানা প্রতিকূলতা ও বড় বড় চ্যালেঞ্জও। এসব প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মৎস্য উৎপাদনের অব্যাহত ধারা ধরে রাখাই এখন বড় ব্যাপার। দেশের অধিকাংশ নদ-নদীগুলোই এখন দখল ও দূষণে জর্জরিত। আর নদী দূষণ রোধ না করা গেলে অন্যান্য মাছের সাথে ইলিশের উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞমহল। নদ-নদীর সাথে খাল, বিল, জলাশয়গুলোও অবৈধভাবে দখল ও ভরাট এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি সেচ দিয়ে সব মাছ তুলে ফেলা, কলকারখানার বর্জ্য জলাশয়ে ফেলা, জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও সচেতনতার অভাব ইত্যাদিও কাক্সিক্ষত পরিমাণ মাছ উৎপাদনের অন্তরায় হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ব্যবহার নিষিদ্ধ অবৈধ কারেন্ট জালের অপরিমিত ব্যবহারও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির আরেকটি অন্যতম প্রতিবন্ধক। অসাধু জেলেরা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতে কারেন্ট জাল পেতে রাখে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক উৎপাদন যেমন ব্যহত হচ্ছে, তেমনি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে অন্যান্য মাছের বংশবৃদ্ধিও। বছরে যে পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ে তার মাত্র শতকরা ২৫ ভাগ যদি রক্ষা করা যায়, তাহলে বছরে এক দশমিক পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব। যার বাজারমূল্য ছয়শ কোটি টাকা।

সমুদ্র মৎস্য আহরণের সম্ভাবনাময় আরেক উৎস। অথচ সমুদ্রে মৎস্য আহরণকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, এ খাতে অর্থ লগ্নীকারীদের মূলধন ঘাটতি, মাছ ধরার প্রয়োজনীয় ফিশিং বোট ও অত্যাধুনিক ট্রলারের সল্পতা, সমুদ্রে মাছশিকারিদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব, সমুদ্রে মাছের মজুদ ও পরিমাণ সম্পর্কে পরিসংখ্যানিক তথ্যের অভাব, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে এ উৎসকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অথচ এ উৎসকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে মৎস উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। এজন্য এ খাতের আধুনিকায়নসহ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিৎ। মৎস্য খাতে রপ্তানি বাড়াতে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোসহ আলাদা ইকোনমিক জোনও তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এ খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারও সময়ের দাবি।

মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক মূর্ত প্রতীক। এ খাতের উন্নয়ন আমাদের অর্থনীতির ভিতকে যেমন মজবুত করবে, তেমনি আমাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদার ঘাটতি পূরণে হবে অন্যতম নিয়ামক। তাই সুচিন্তিত সঠিক কর্মকৌশল ও পরিকল্পনামাফিক যদি এ খাতকে আরো বেশি পরিচর্যা করা যায়, তাহলে সুফল মাটিতে ধান আর টলটলে জলের পুকুর ও নদীর মাছে বাঙালির ভাত ও মাছ খাওয়ার যে পরম্পরা ও রসায়ন আছে, তা অবিচল থাকবে অতীতের মতো।

লেখক: প্রভাষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading