বিপন্ন পৃথিবীকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার
রাশেদুজ্জামান রাশেদ । বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
পৃথিবী নামক গ্রহ বাদে অন্য কোনো গ্রহে মানুষের বসবাসের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভবিষ্যৎতে বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে মঙ্গল গ্রহে বসবাস করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আপাতত আমরা বলতে পারি পৃথিবীরই হচ্ছে আমাদের আশ্রয়স্থল অর্থাৎ মানবজাতির বসবাস। মানুষ ইতিহাসের বিবর্তন থেকে বর্তমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে আমরা নিজের প্রয়োজনে পৃথিবীকে অনেক সুন্দরভাবে সাজিয়েছি। তার মধ্যে তৈরী করে ফেলছি স্যাটেলাইট, কৃত্রিম উপগ্রহ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন, নিত্য নতুন ফসলের বীজ উদ্ভাবন, ন্যানো টেকনোলজি, বায়োলজিক্যাল টেকনোলজি, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেমোরি সংরক্ষণ, সাইকোলজিক্যাল নানা গবেষণাপত্র, পশু এবং মানুষের জীন আবিষ্কার, রোবট এবং কৃত্রিম অস্তিত্ব তৈরিতে মানবজাতি সক্ষম। কিন্তু দুঃখের বিষয় যত দিন যাচ্ছে ততই যেন মানবজাতির অবহেলায় পৃথিবীতে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি এবং পরিবেশের প্রধান উপাদান তিনটি মাটি, পানি ও বায়ুকে দূষিত করে মানবজাতি হুমকির মধ্যে পড়ছে।
আপনি বাড়ি কিংবা অফিস থেকে বের হয়ে দেখবেন অলিতে-গলিতে পায়ের নিয়ে পড়ে আছে প্লাস্টিক টুথ ব্রাশ, ক্যান, বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিকের বোতল। এ ছাড়া শহর কিংবা গ্রামে ছোট, বড় অনুষ্ঠানে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাস ও প্লেট ব্যবহার করা হয়। ব্যবহার শেষে যত্রতত্র ফেলে রাখা দেখা যায়। যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণের একটি। এভাবে নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে বহুগুণে বেড়ে গেছে। যার ফলে মানুষের পাশাপাশি সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীর বাস্তুতন্ত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
মানুষ মানেই আরামপ্রিয় অর্থাৎ সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার জন্য শহর কিংবা গ্রামে বড় বড় দালানকোঠা তৈরী করেন। আর তার জন্য প্রয়োজন ইট। বিশেষ করে আমাদর দেশে ইট জোগান দেয় পুঁজিবাদীরাই। কিন্তু সারা দেশে ইট প্রস্তুত ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন- ২০১৩ কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নামে বেনামে সরকারি জমি দখল করে হোক, আবাসিক এলাকায় ইটভাটা ও কৃষি জমির পাশে ব্যক্তি গত উদ্যোগে ইটে ভাটা স্থাপন করা হয়। এতে করে ভাটা চালু ও বন্ধের আগে গরম বাতাসে ও গ্যাসে কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন হয় না। ফলের বিভিন্ন উদ্ভিদে ফল ধরে না। ইট ভাটার আশেপাশে বাসা বাড়িতে ধুলাবালু ও ছাই পড়ে রাতে ঘুমাতে কষ্ট হয়। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট তথ্য মতের রাজধানী ঢাকার মানুষের আয়ু প্রায় সাড়ে সাত বছর কমেছে। এর প্রধান কারণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া, মিলকারখান ও ইট ভাটার কালোধোঁয়া ইত্যাদি। পরিবেশের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যাওয়া মানে মানবজাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার সমান।
বাংলাদেশ ও ভারত সীমানায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বন সুন্দরবন। প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ বনের ষাট ভাগ অংশ বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত। যা বাংলাদেশের মানুষের গর্বের বিষয়। বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে গড়ে ওঠা সুন্দরবন সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আগ্রাসন থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনবসতির প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসাবে কাজ করে। এ বনে ৩১ শতাংশের জলভাগে ৪৫০টি নদ-নদী ও খাল রয়েছে। বনে লবণাক্তভোজী প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরীসহ রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। এক মাত্র সুন্দরবনেই ঘূর্ণিঝড়, ঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সুন্দরবন রক্ষা না করে আমরা ধ্বংস করার কাজে ব্যস্ত থাকি। আমাদের একটুও স্মরণ হয় না যে সুন্দরবন ধ্বংস হলে আমরা বিপন্ন জাতিতে পরিণত হব।
দেশ ও পৃথিবীকে বাঁচাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে দেশের মানুষকে মুক্ত বায়ু সেবন করতে দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ওপর জোর দিত হবে। গাড়ির নির্গত ধোঁয়া বায়ুর সঙ্গে মিশে দূষণ ঘটাতে পারে। তাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশের ইকোসিস্টেমকে সুস্থ রাখতে হবে। কীটনাশক ও কেমিক্যালের ব্যবহার কমতে হবে। বর্জ্য পদার্থ রিসাইকেল করতে হবে। পরিবেশে আমরা রক্ষা করতে পারলে পরিবেশেও আমাদের রক্ষা করবে। তাই পরিবেশ দূষণে বিপন্ন পৃথিবী বাঁচার দায়িত্ব আমাদের সবার। শুধু মানবের সেবায় মানবতার পরিচয় নহে জগৎতের সেবায় মানবতার পরিচয়।
লেখক- কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

