রেলক্রসিং দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতার বিকল্প নেই

রেলক্রসিং দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতার বিকল্প নেই

ইফতেখার রায়হান । বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২ । আপডেট ১৩:২০

সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে রেলক্রসিংয়ের গেটম্যানের দায়িত্বহীনতার কারণে। রবিবার সকাল সাড়ে ৭টায় পোশাকশ্রমিকবাহী বাস শ্রীপুরের মাইজপাড়া রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ময়মনসিংহগামী বলাকা কমিউটার ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই বাসযাত্রী এক নারী নিহত ও ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে পরে আরও চারজন মারা যান। রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় বিভিন্ন যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য রেলক্রসিংয়ের দারোয়ানদের গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে। মাইজপাড়া রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনাও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, রেলপথে যাতায়াত অনেকটা নিরাপদ ও আরামদায়ক। কিন্তু যখন নানা কারণে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে- তখন তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে অরক্ষিত রেলক্রসিং নিয়ে যেসব তথ্য সামনে আসে তা অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। সারাদেশে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে বৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৪১২টি; এর মধ্যে ৯৪৬টিতে, অর্থাৎ ৬৭ শতাংশে গেট নেই, এমনকি নেই যান নিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মীও।

অভিযোগ উঠেছে, রেলক্রসিংয়ের দারোয়ান দুর্ঘটনার সময় অকুলস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ট্রেন আসার সিগন্যাল না থাকায় বাসটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। দেশে যতগুলো রেলক্রসিং রয়েছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে কোনো দারোয়ান বা প্রহরী নেই। যেগুলোর আছে সেগুলোর দারোয়ানরা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বারবার দুর্ঘটনা ঘটলেও অব্যবস্থা ও দায়িত্বহীনতার অবসান হয়নি। গাজীপুর জেলা কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার পর চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। জেলা প্রশাসক দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নিহতদের লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করব তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী তা উদ্ঘাটন করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। পাশাপাশি রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রহরীরা যাতে সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করেন তা নিশ্চিত করা জরুরি। যেসব রেলক্রসিংয়ে দারোয়ান নেই সেগুলোয় দারোয়ান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে আমরা এমনটিই দেখতে চাই।

বাংলাদেশের রেলপথগুলো কতটা অরক্ষিত এবং এর নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন সময়ের দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে। রেলওয়ে এবং রেলওয়ে পুলিশের দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, অরক্ষিত ও সুরক্ষিত সব ধরনের রেলক্রসিংয়ে পথচারীরা সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির শিকার হচ্ছে। তবে রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের নিচে গাড়ি চাপা পড়া ও ধাক্কা খেয়ে ছিটকে প্রাণহানির ঘটনাও কম নয়। গত এক বছরে রেলক্রসিংয়ে ৩৩টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হয়েছে। আর এই সংখ্যা রেললাইনে কাটা পড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের হিসাব বাদেই। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারাদেশে অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। আরও আছে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সড়কে। সরকারের কমবেশি পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের উপর সড়ক নির্মাণ করার কারণে রেলক্রসিং সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মনে করি, অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আমলে নেওয়া অপরিহার্য।

সর্বোপরি বলতে চাই, যদি ৬৭ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত থাকে তবে তা কতটা ভয়ানক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে সেটি আমলে নেওয়ার বিকল্প নেই। একের পর এক, নানা কারণে রেলদুর্ঘটনা ঘটছে, এগুলো যেমন আমলে নিতে হবে- তেমনি রেলক্রসিং সুরক্ষিত করা এবং দুর্ঘটনা এড়াতে সামগ্রিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটবে এবং মানুষ চলে যাবে না ফেরার দেশে এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে রেলক্রসিং সুরক্ষিত করাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক এমনটি কাম্য।

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading