আগস্ট এলেই বাঙালি-হৃদয়ে নেমে আসে শোকের আঁধার

আগস্ট এলেই বাঙালি-হৃদয়ে নেমে আসে শোকের আঁধার

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ । শনিবার, ০৬ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:২০

শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়, তিনি নিজেই এক অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রমী ইতিহাস। সমাজ, দেশ ও কালের প্রেক্ষাপটে তিনি ব্যক্তি মুজিব থেকে হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা থেকে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহানায়ক।

দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের নেপথ্যের কারিগর বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সমগ্র বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। তার হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে প্রথমবারের মতো অঙ্কিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিরূপে। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছর পর একদল অকৃতজ্ঞ বাঙালি নৃশংসভাবে হত্যা করে জাতির পিতাকে। ১৯৭৫ সালের এ মাসেই বাঙালি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এদিন ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল এবং পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালসহ পরিবারের ১৭ জন। ১৫ আগস্টের কালরাতের পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া, ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও বাঙালি জাতি পদে পদে বঙ্গবন্ধুর অভাব অনুভব করে। বাঙালির প্রতিটি অর্জনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে।

গোটা মাসটিই যেনো ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। আগস্ট এলেই শ্রাবণের এক অনিঃশেষ করুণ-ধারা যেনো ছুঁয়ে যায় বাঙালি-আত্মাকে। এ-মাসের বেদনার্ত আর্তি কালকে ছাপিয়ে মহাকাল, সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্ব বিবেককে স্তম্ভিত করেছে! একদিকে বাংলাদেশবিরোধী দেশী-বিদেশী ঘাতকচক্রের সুপরিকল্পিত মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞ বা হত্যা-নকশা, অন্যদিকে ‘নিয়তি’ বা ‘ভাগ্য’ নির্ধারিত বিয়োগান্তুক ঘটনা; সব মিলিয়ে আগস্ট যেনো শোকের শ্রাবণধারা। আগস্ট মাসটির নাম উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বাঙালি-হৃদয় যন্ত্রণাদগ্ধ হয়, শোকে মুহ্যমান হয় বাঙালি-আত্মা। হৃদয়পটে ভেসে ওঠে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। আরও হত্যা করা হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসের, শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তসত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি, সুকান্ত আবদুল্লাহ, আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত।

১৯৭৫ সালের এ মাসে যেমন বাঙালি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যা-চেষ্টা করা হয়েছিল জাতির জনকের কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী, আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হন। ওই দেশবিরোধী ঘাতকচক্র ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশব্যাপী একযোগে ৬৩টি জেলায় সিরিজ ৫০০ বোমা হামলা চালিয়ে প্রিয় এই মাতৃভূমিকে মৃত্যুপুরিতে পরিণত করেছিল।

আগস্টে এমন মৃত্যুগুলো আমাদেরকে অশ্রুসজল করে তোলে। এই আগস্ট মাসেই ওইসব বিখ্যাত বাঙালিদের মৃত্যু ছিলো যেনো নিয়তি নির্ধারিত! সহমর্মিতা প্রকাশ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিবেশীর ওপর শোকের কালো আঁধার নেমে এলে কোনও সুস্থ, বিবেকবোধ-সম্পন্ন মানুষ সুখ-সাগরে ভাসতে পারে না, উল্লাসে ফেটে পড়তে পারে না। বরং শোক সন্তপ্ত প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, শোকাহত প্রতিবেশীর সাথে একাত্ম হয়ে শোককে ভাগাভাগি করে নেওয়াটাই মানবিকতা ও মনুষত্বের পরিচয়। এটাই আমাদের সামাজিক, মানবিক রীতি। এমনকি, চরম শত্রুর মহাবিপদের দিনে, মহাদুর্দিনে বা শোকের দিনে আমরা আনন্দ উৎসবে মেতে উঠি না। কোনও শ্রেণিকক্ষ থেকে আমাদের এই শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়নি।

লেখক, প্রতিষ্ঠাতা,জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading