শিশুশ্রম নির্মূলে বাড়াতে হবে সামাজিক সুরক্ষার আওতা

শিশুশ্রম নির্মূলে বাড়াতে হবে সামাজিক সুরক্ষার আওতা

ফারজানা ইসলাম । সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:৪০

আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুরাই আগামীর দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। কিন্তু শ্রমের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিশুদের দুরন্ত শৈশব এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়। আইএলওর জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ। প্রতি ৬ জন শিশুর মধ্যে একজন শিশুশ্রমে নিযুক্ত। পাচার, সন্ত্রাস, নির্যাতন প্রভৃতি কারণে প্রতি বছর প্রায় ২২ হাজার শিশু মারা যায়। শ্রম অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৬৯ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। ইউনিসেফের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে শিশুর সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশি। ৯০ শতাংশ প্রাথমিকভাবে স্কুলে গেলেও শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই অর্ধেকের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বিশ্বখাদ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ শিশুশ্রম দিচ্ছে কেবল খাদ্যের বিনিময়ে। ২৩.৭ শতাংশ শিশুকে মজুরি দেওয়া হলেও এর পরিমাণ শিশু আইনের তুলনায় নগণ্য।

বাংলাদেশে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা, ১৮ অনুচ্ছেদে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ২৮ অনুচ্ছেদে কল্যাণ ও উন্নয়ন বিশেষ আইন প্রণয়ন করা এবং ৩৪ অনুচ্ছেদে জোরপূর্বক শিশুশ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে অসংখ্য নীতিমালা। ২০১১ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুনীতিতে বলা হয়েছে, ৫-১৮ বছরের কোনো শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। ৫-১৪ বছরের শিশুকে কর্মে নিয়োগ দেওয়া দন্ডনীয় অপরাধ। শিশু আইন ২০১৩-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন বা অবহেলা করেন তা হলে ওই ব্যক্তি অনধিক ৫ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩১০ ধরনের অর্থনৈতিক কাজ-কর্মে শিশু শ্রমিকরা শ্রম দিচ্ছে।

আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই ঘটছে শিশুশ্রমিকদের প্রতি অমানবিক নির্যাতন। শিশু গৃহকর্মী কাজ করতে গিয়ে পেস্নট ভাঙার অপরাধে মালিকের নির্মম নির্যাতন, হোটেলের শিশু ওয়েটার গস্নাস ভাঙার অপরাধে মালিকের নির্যাতন, শিশুশ্রমিক কাজে ভুল করায় বেঁধে লোমহর্ষক নির্যাতন। এমনই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শিশুরা প্রতিনিয়ত কীভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়, তা আমরা গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখে থাকি। লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০-২৫ লাখ শিশু আছে যাদের পথশিশু বলা হয়। এ সব শিশু অভাবের তাড়নায় ভেঙে যাওয়া পরিবার থেকে বেরিয়ে পথে নেমেছে। এ সব শিশু রাত কাটায় বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, ফুটপাত, পার্ক, রাস্তা কিংবা খোলা জায়গায়। এরা পথশিশু। এরা পথেই থাকে, পথেই জীবিকা নির্বাহ করে। এদের সবার বয়স ৫-১৮ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন প্রকার অপরাধ, অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে, কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। কেউ পাচার চক্রের পালস্নায় পড়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়। একপ্রকার দুষ্টচক্রের সিন্ডিকেট এ সব পথশিশুকে নানান অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহার করে। মেয়েশিশুদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও যৌনকর্মে লিপ্ত করা হয়।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। আজকের শিশুরাই আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার সুমহান দায়িত্ব হাতে নেবে। এ জন্য শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে, সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও মেধার বিকাশের জন্য নানা ধরনের পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে শিশুরা অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিপুল পরিমাণ জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে আমাদের সার্বিক উন্নতি মুখ থুবড়ে পড়বে। কেননা আজকের যারা শিশু, যারা নবীন তাদের উপরই আগামীর দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। শিশুদের শ্রম থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে দুরন্ত শৈশব, করে তুলতে হবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত। শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবধর্মী কার্যকর পদক্ষেপ। সর্বোপরি শিশুশ্রম বন্ধে এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। সবার সমন্বিত উদ্যোগে শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব।

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading