দেশে প্রতিদিন ৪৫০ জনের মৃত্যু: তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী হোক

দেশে প্রতিদিন ৪৫০ জনের মৃত্যু: তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী হোক

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৯:১৫

দেশে তামাকজনিত রোগে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যু প্রতিরোধ করতে যত দ্রুত সম্ভব তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এখন থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে গণমাধ্যমকেও। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বর্তমান বিশ্বে উজ্জল এক নাম বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে এবং তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্রে জনগনের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যেমন গুরুত্ব বহন করে বাংলাদেশে সেই চিত্র যেন ভিন্ন। আর এর প্রধান কারনগুলোর মধ্যে অন্যতম তামাক ও তামাকজাত পণ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন ২০৪০ সালের মধ্যে তামাক মুক্ত হবে বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যে তার সরকারও কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। তামাকজাত পণ্যে যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে সরকার, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি সাধন হচ্ছে। এ ক্ষতি আর্থিক দিক থেকেই শুধু নয়; সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তি স্বাস্থ্যের ক্ষতিও। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য অনেকটা তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনকে দায়ী করছেন। এজন্য তারা আইনের সংশোধনও প্রয়োজন বলে মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, তামাকের দুর্বল আইনের কারণে দেশের জনগণকে তামাকে আসক্ত করতে সুবিধা পাচ্ছে তামাক ও তামাকজাত পণ্য কোম্পানিগুলো। তাই দেশকে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধন জরুরি বলেছেন তারা।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আইনকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন: দেশে তামাকজনিত রোগে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যু প্রতিরোধ করতে যত দ্রুত সম্ভব তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সোমবার ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি হোটেলে ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের সহযোগিতায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ কর্মশালাটি আয়োজন করে। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার (ক্লিনিকাল রিসার্চ) ডা. শেখ মো. মাহবুবুস সোবহান। তিনি বলেন, তামাকজাত দ্রব্যের বহুল ব্যবহার হৃদরোগ, ক্যানসার, বক্ষব্যাধি ও অন্যান্য অনেক প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। দেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তামাকের এসব ক্ষতি থেকে জনস্বাস্থ্যকে রক্ষার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। যত দ্রুত আইনটি সংশোধন করা হবে তত বেশি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের লিড পলিসি অ্যাডভাইজর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে বিদ্যমান ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এফসিটিসির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।

তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করায় গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী। এ সময় তিনি জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনকে ত্বরান্বিত করতে গণমাধ্যমকর্মীদের আহ্বান জানান।

সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, যদিও তামাকজাত দ্রব্য থেকে সরকারি কোষাগারে বড় একটা অংকের টাকা প্রতিবছর জমা হয়, কিন্তু এই টাকা কিন্তু তামাক থেকে ইনকাম হয়ে আসে না। আসলেও সেটা খুবই কম। তাহলে সরকারকে দেওয়া এই টাকাটা কোথায় থেকে আসছে? প্রকৃত অর্থে সেটা কিন্তু পাবলিকের পকেট থেকেই যাচ্ছে। জনগণ তার পকেটের অর্থ দিয়ে তামাক কিনছে, আবার যখন এই তামাকের কারণে সে নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তখন আবার সেই তাদের পকেট থেকেই বড় আকারের খরচ হচ্ছে। এই যে তামাকের কারণে মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, সেটা তো সরকারকে ভাবতে হবে‘, যোগ করেন এই গবেষক।

৮০ শতাংশ মৃত্যুর কারন হতে পারে তামাক: চলতি বছরের মে মাসে পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং তিন দিনব্যাপী সামাজিক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানেও তামাকের ক্ষতিকর দিক ও ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই সেমিনারে ৪০ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের সদস্যদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্যকরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর অন্তত ৮০ ভাগের মৃত্যু তামাকের কারণেই হবে।

তামাক নিয়ন্ত্রণে গণমাধ্যমকেও
গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে হবে

তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে হবে, সেই সুযোগ তাদের আছে। সংবাদপত্রে তামাকের বিরুদ্ধে সংবাদ বাড়াতে হবে। দেশে তামাক চাষ বন্ধ করতে হবে। তাহলেই তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে বারবার সংবাদ প্রচার করতে হবে। শহর থেকে গ্রাম সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে এবং যারা তামাক গ্রহণ করে আজ ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তা তুলে ধরতে হবে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. অরূপ রতন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, দেশকে তামাকমুক্ত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০৪০ সালের মধ্যে সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে; সে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এজন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কিছু ধারা সংশোধন জরুরি। এজন্য তারা এরই মধ্যে সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- খুচরা সিগারেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে; জর্দা, গুল, তামাক উৎপাদন ও বিক্রিতে কঠোরভাবে নজরদারি এবং প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। তিনি বলেন, ধূমপান ছাড়ার জন্য কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই। আপনার একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া সংশোধনী দ্রুততম সময়ের চূড়ান্তকরণের দাবি করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান। গত জুলাই মাসে একটি অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। ড. আতিউর রহমান বলেন, ধূমপান ও তামাকদ্রব্য ব্যবহার আইন শক্তিশালীকরণের যে খসড়া প্রস্তাবটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে তাতে তামাকবিরোধী অংশীজনদের দাবি ও পরামর্শগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়ার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই খসড়া সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা দরকার।

উত্তরদক্ষিণ । ০৯ আগস্ট ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

কঠোর নীতির পরিকল্পনা করছে সরকার: দেশে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর নীতির কথা ভাবছে সরকার। ‘সিগারেট’ এখনও অত্যাবশকীয় পণ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত থাকায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে গত ২০ জুলাই বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষকে একটি চিঠি দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের (এনটিসিসি) সমন্বয়ক (অতিরিক্ত সচিব) হোসেন আলী খোন্দকার। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬ সংশোধন করে অত্যাবশকীয় পণ্যের তালিকা থেকে সিগারেটকে বাদ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে এ চিঠিতে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. জাহিদ মালেকও এতে সম্মতি দিয়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ৬৬ বছর আগে প্রণীত দ্য অ্যাসেন্সিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টের আওতাভূক্ত কোনো পণ্য সারাদেশে অবাধে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিপণন করা যায় এবং দেশে জরুরি পরিস্থিতির সময়ও এসব পণ্য বিপণনে বাধা বা বিধি-নিষেধ আরোপ করা যায় না। অত্যাবশকীয় পণ্যখাতে শ্রমিকরা ধর্মঘটও ডাকতে পারে না এবং কোন অত্যাবশকীয় পণ্য মজুদ করা যায় না।

সম্ভবত আর কোন দেশ এভাবে ঘোষণা দিয়ে তামাক নির্মূলের কথা বলেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন। আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এমন একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছেন, যে দেশ পুরো বিশ্বের মধ্যে তামাক চাষে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। নিঃসন্দেহে একটি সুস্থ জাতি গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ আমাদের উৎসাহিত করছে, অনুপ্রাণিতও করছে।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading