উত্তরা-চকবাজারে পৃথক ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু: অকালে ঝরবে আর কত প্রাণ!
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:২০
রাজধানীর উত্তরা ও চকবাজারে পৃথক দু’টি দুর্ঘটনায় ঝড়ে গেছে ১১টি তাজা প্রাণ। চকবাজারে আগুনের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যু হয় ৬ জনের, অন্যদিকে উত্তরার জসিমদ্দিনে বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে গাড়িতে থাকা অবস্থায় প্রাণ হারান আরও পাঁচজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, অবহেলা, গাফিলতি আর পরিকল্পনাহীনতার অভাবেই বারবার ঘটছে এসকল দুর্ঘটনা। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস।
অবহেলা, পরকিল্পনাহীনতা ও খামখেয়ালিপনা যেন পেয়েই বসেছে দেশের প্রতিটি সেক্টরে। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি সবর্ত্রই। সীতাকুন্ড ট্রাজেডি, মিরসরাই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই জাতীয় শোক দিবসের দিনে ঘটল আরও দুই দুর্ঘটনা। যা শোককে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুনের ঘটনায় পুড়ে মারা যান ৬ জন, অন্যদিকে উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে গাড়িতেই মৃত্যু হয় পাঁচ জনের। এ ধরণের দুর্ঘটনা দেশে সতুন নয়, প্রতিনিয়দ ঘটছে। কিন্তু প্রাণের বিনিময়েও পরিবর্তন মিলছে না। চকবাজারে লাখো কারখানা রয়েছে, কিন্তু সেখানে নেই ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতি বছরই ছোট-বড় দুর্ঘটনা রাজধানীর এই এলাকা থেকে মেলে। কর্তৃপক্ষ কী ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা এ ধরণের নিত্য দুর্ঘটনা থেকেই প্রমাণ মেলে। অন্যদিকে, উত্তরার এমন দুর্ঘটনায় কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটি বললেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলছেন বিশ্লেষকগণ।
ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে নিহত ৫: রাজধানীর উত্তরার জসীমউদদীনে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে বিআরটি প্রকল্পের কাজের সময় ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে ৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুই জন। সোমবার (১৫ আগস্ট) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। নিহতরা হলেন রুবেল (৬০), ফাহিমা (৪০), ঝরনা (২৮), জান্নাত (৬) ও জাকারিয়া (২)। আহতরা হলেন হৃদয় ও রিয়া। মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ক্রেন দিয়ে একটি গার্ডার উপরে তোলার সময় নিচে পড়ে যায়। গার্ডারটি একটি প্রাইভেট কারের ওপরে পড়ে।
নবদম্পতিকে নিয়ে যাচ্ছিল পরিবার: হৃদয়ের (২৮) সঙ্গে রিয়া মনির (২১) গত শনিবার বিয়ে হয়। সোমবার (১৫ আগস্ট) বৌভাত শেষে রিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন হৃদয় ও তার পরিবারের সদস্যরা। ছেলে হৃদয়ের বাবা রুবেল গাড়ি চালাচ্ছিলেন। রাজধানীর উত্তরার জসীম উদদীনে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে পৌঁছালে বিআরটি প্রকল্পের একটি ক্রেন থেকে গার্ডার তাদের প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে। এতে নবদম্পতিসহ চার জন নিহত ও দুই জন আহত হন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনা শোনার পর ঘটনাস্থলে আসেন। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে উত্তরার জসিম উদ্দিন রোড এলাকা।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, বৌভাত শেষে দক্ষিণ খান থেকে আশুলিয়ায় যাচ্ছিল গাড়িটি। মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে যাচ্ছিলো তারা। এ সময় গাড়িতে ছিলো নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়া মনি। গাড়ি চালাচ্ছিলেন ছেলের বাবা রুবেল। ছেলের বোন ঝরনা বেগম (২৮) এবং তার দুই সন্তান জান্নাত (৬) ও জাকারিয়া (৩)।
বিআরটি বলছে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এ দুর্ঘটনা: এদিকে, ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে ৪ জন নিহতের ঘটনা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বিআরটি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুল ইসলাম। দুর্ঘটনার পর শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের গার্ডারটি ক্রেনে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়ার সময় সম্ভবত ক্রেন কাত হয়ে নিচে পড়ে যায়।ঘটনার জন্য কে দায়ী এবং কীভাবে ঘটলো জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমি না জেনে কিছু বলতে পারবো না। ক্রেন কাত হয়ে গেছে এটা যান্ত্রিক সমস্যা। এটা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত না জেনে কিছু বলতে পারবো না।
প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, সমবেদনা: রাজধানীর উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে ক্রেন থেকে একটি প্রাইভেট কারে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং জানায়, মৃত্যু ও আহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মরহুমদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
‘আছে অবহেলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা’
উত্তরায় ফ্লাইওভারের গার্ডার দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে ঠিকাদারি কোম্পানির অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে পুলিশের বয়ানে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তার চর্চাগুলো অনুসরণ করা হলে এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কোনো কারণই নেই। এখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিলও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। বলেছেন, ঠিকাদার সঠিকভাবে সব সাবধানতা মেনে কাজ করছে কি না, এটি তদারকির দায়িত্ব প্রশাসনের। সেটি করা হয় না বলেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অবহেলা করে থাকে।

ছিল না কোনো নিরাপত্তা-বেষ্টনী: অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, এটা একটা ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাতেই কাজ চলবে, সেটি সমস্যা না। সেখানে দিনে হোক আর রাতে হোক যখন ভারী উপকরণ বা সরঞ্জাম আপনি বহন করবেন, সেটা ক্রেনের মাধ্যমে হোক আর যেকোনো মাধ্যমে হোক না কেন, ইন্টারন্যাশনাল প্র্যাকটিসটা হচ্ছে অবশ্যই একটা নিরাপত্তা-বেষ্টনী তৈরি করতে হবে আগে। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো নিরাপত্তা-বেষ্টনী ছিল না।
অতীত থেকেও নেয়া হয়নি শিক্ষা: গত ১৫ জুলাই গাজীপুরে একই প্রকল্পের ‘লঞ্চিং গার্ডার’ চাপায় এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক ও একজন পথচারী আহত হন। ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ঢাকার তেজগাঁও ও মালিবাগ মোড় এবং চট্টগ্রামেও প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে ২৯ জনের প্রাণহানি হয়। এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা গণমাধ্যমে আসেনি।
চকবাজারের পোড়া ভবন থেকে ৬ লাশ উদ্ধার: পুরান ঢাকার চকবাজারে সোমবার (১৫ আগস্ট) বেলা ১২টার দিকে কামালবাগের দেবী দাস ঘাট এলাকার চারতলা ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সর্ভিসের দশটি ইউনিট সোয়া দুই ঘণ্টার চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুনে পোড়া ভবন থেকে ছয়জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। তারা হলেন- মো. শরিফ (১৫), মো. বিল্লাল (৩৫), মো. স্বপন (২২), মো. ওসমান (২৫)। অপর দুজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত হলেও ডিএনএ পরীক্ষা করার পরই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ধোঁয়ার কারণে আগুন নেভাতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। কারণ প্লাস্টিক জাতীয় জিনিসপত্র থাকায় সেখানে আগুন লাগার পর ধোঁয়ার পরিমান খুবই বেড়ে যায়। ভবনটি এমনভাবে তৈরি, যেখানে আগুন লাগার কাছাকাছি জায়গায় গিয়ে সেখান থেকে পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেক দূর থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আগুন নেভাতে কাজ করে যেতে হয়। পরবর্তী সময়ে অন্য ভবনের ছাদে উঠে সেখান থেকে পানি ছেটানো হয়। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, তিন তলা ভবনের ওপর সেখানে টিন দিয়ে আরেকটি তলা বানানো হয়েছে। নীচতলায় একটি খাবার হোটেল ছিল, নাম বরিশাল রেস্তোরাঁ। তৃতীয় তলার ছিল প্লাস্টিকের গুদাম আর কারখানা। চতুর্থ তলায় প্লাস্টিকের খেলনার গুদামও আগুনে পুড়ে গেছে। এছাড়া পাশের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলাও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুরান ঢাকার চকবাজারের সেই পলিথিন কারখানাসহ আশপাশের অনেক ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, পুরান ঢাকার চকবাজারের সেই পলিথিন কারখানাসহ আশপাশের অনেক ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনগুলোতে অনেক কারখানা আছে। সোমবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে ওই কারখানা পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে অনেক কারখানা আছে। এসব কারখানায় যেকোনো সময় অগ্নিকান্ড ঘটতে পারে। আশপাশের অনেক ভবনে বসবাসরত মানুষরা ঝুঁকিতে আছেন।

দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি: বিশ্লেষকরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উন্নয়ন কাজ তথা নির্মাণ কাজ করায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, ফলে এটা নিছক দুর্ঘটনা না, এটি অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড। এর দায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। চকবাজারে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকান্ডে নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, এ ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ধরনের অগ্নিকান্ড ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কারখানা চালানো ও উন্নয়নের নামে এ ধরনের হত্যাকান্ডের জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং হতাহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
ইউডি/সুস্মিত

