মানবতার সেতু গড়ে তোলার এখনই সময়

মানবতার সেতু গড়ে তোলার এখনই সময়

নাজরীনা জেবিন । শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৩:২৫

মানবতা তখনই সবোর্ৎকৃষ্ট পর্যায়ে অবস্থান করে যখন তা পরিপূণর্ভাবে যথার্থ স্থানে প্রয়োগ করা যায়। অন্যথায় মানবতা কথাটির প্রকৃত কোনো অথর্ প্রকাশ পায় না। সবার অন্তরে যেমন মানবতা বিরাজমান থাকে না তেমনই সব ক্ষেত্রে মানবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো ঠিক নয়। মানুষ থেকে মানবতার সৃষ্টি আবার মানুষ দ্বারাই সেই মানবতার ধ্বংস করা হয়। সর্ব অবস্থায় একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের সবচাইতে দুবর্ল দিকটি খুঁজে আর সময় সুযোগ বুঝে চরমভাবে আঘাত করে। তখন মানুষের গায়ে শত জোর থাকলেও মানুষ ও মানবতা হিংস্র রূপ ধারণ করে। চলমান সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানবতার দোহাই দিয়ে চলে হাজারো নৈতিকতাবিরোধী কমর্কাণ্ড। মানবতা শব্দের সঙ্গে গভীরভাবে যে শব্দটি জড়িয়ে আছে তা হচ্ছে নিঃস্বাথর্। কারণ কোনো ব্যক্তি যখন মানুষের কল্যাণে কাজ করে তখন তা থাকে সম্পূণর্ স্বাথের্র বাইরে। কিন্তু বতর্মানে একেবারে স্বাথের্র বাইরে মানুষ কাজ করে তা স্থিরভাবে বলা কিছুটা বোকামির পরিচয় দেয়া হবে। তাতে প্রত্যক্ষভাবে নিজস্ব কোনো স্বাথর্ না থাকলেও পরোক্ষভাবে রয়েছে নানান ধরনের স্বার্থ।

মহা ধুমধাম করে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করা হলো। বাংলাদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়া এই সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানের চাকচিক্য চোখ ধাধিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বের। যার ফলে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষের দুঃখ দুর্দশা কারো নজরে পড়ছে না। আতশবাজি আর ধুমধাড়াক্কা মিউজিকে ঢাকা পড়ছে সুরমা তীরের বন্যার্ত মানুষের আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাদ। সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মানুষ আর গবাদি পশুর মৃতদেহের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মারাত্মক বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ। কিন্তু পানির সঙ্গে লড়াই করা অসহায় মানুষগুলোর কান্না শোনার অবকাশ কেউ পাচ্ছে না। পদ্মা সেতুতে জন্মবার্ষিকী, বিবাহবার্ষিকী আর প্রেমবার্ষিকী পালন করা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। মিডিয়াগুলো ব্যস্ত নাট-বল্টু খোলার বিভিন্ন থিউরির ব্যাখ্যা নিয়ে। মানুষের অসহায়ত্ব নিয়ে তাদের টুঁ শব্দটি নেই। মানুষ ও মানবিকতা সম্পন্ন মানুষের মাঝে যেমন তফাৎ রয়েছে তেমনভাবে মানবতা ও লোক দেখানো মানবতার তফাৎ কম নয়। সমাজের এমন ভাসমান ব্যক্তিরা চায় নিমেষে তাদের চোখের সামনে থেকে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটাতে যা তারা উপলব্ধির মাধ্যমে গ্রহণ থেকে বিরত থেকে উপভোগ করবে। নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য নিরবে অন্য প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিকে দূরে সরিয়ে দেবে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা আজ কার রসুইঘরে কি রান্না হচ্ছে, কে আজ পাঁচ তারকা হোটেলে কি খেলো দুনিয়া সুদ্ধ মানুষ জেনে যাচ্ছে। কিন্তু পানিবন্দি এই মানুষগুলো দিনের পর দিন না খেয়ে রয়েছে। বুক সমান পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একমুঠো খাবারের আশায়। একটু সাহায্যের আশায়। এক লহমায় জমি, বাড়ি, ফসল, গবাদি হারিয়ে নিঃস্ব অবলম্বনহীন এই মানুষগুলো বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে, কোথায় যাবে। দু’হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া যেন তাদের আর কোন গতি নেই।

অসহায়, দুস্থ ও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে সবাইকে সাধ্যমতো এগিয়ে আসতে হবে। অনেক প্রবাসীরা দেশের মানুষের অসহায়ত্ব দেখে তাদের সাহায্য করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সশরীরে চলে গেছেন বানভাসি অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। এইসব মহৎ উদাহরণ দেখে অন্য সামর্থ্যবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। বন্যার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের এ লড়াই কারো একার নয়। শুধু প্লাবিত এলাকার মানুষের একার বেঁচে থাকার লড়াই নয়। এই লড়াই বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের। তাই দেশে কিংবা বিদেশে যে যেখানে থাকুন না কেন বন্যার্ত মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আসুন সবাই ত্রাণ বিতরণের প্রতিযোগিতা করি। নিরন্ন লাখো মানুষের মুখে খাবার তুলে দেই। বস্ত্রহীন মানুষদের নতুন না হোক পুরনো কাপড় দিয়ে তাদের লজ্জা নিবারণের সুযোগ করে দেই। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা মানুষের হাতে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধ তুলে দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করি। দেশের বিত্তবানরা আসুন মানবিক সহায়তা দিয়ে পানিবন্দি মানুষদের বাঁচান। বিপন্ন অসহায় মানুষদের সহায়তা করে, মানবতার সেতু গড়ে তুলবার এখনই সময়।

লেখক: সাংবাদিক।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading