হাওয়া: বাংলা সিনেমায় নতুন জোয়ার

হাওয়া: বাংলা সিনেমায় নতুন জোয়ার

নাসরিন আক্তার । রবিবার, ২১ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫

মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম সৃষ্টি হাওয়া বাংলা সিনেমায় নতুন জোয়ার বয়ে এনেছে। সম্প্রতি আর কোনো সিনেমা নিয়ে হলে দর্শকের এমন উপচে পড়া ভীড় দেখা যায়নি। প্রচুর কথা হয়েছে চলচ্চিত্র সমালোচক মহলেও। হাওয়ার এমন সাফল্য প্রমাণ করে বাংলাদেশে সিনেমার প্রচুর দর্শক আছে যাদের ভালো সিনেমা দিতে পারলে হলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। শুধু তাই নয়, হাওয়া বাংলা সিনেমার গৌরবজ্জ্বল স্বর্ণালী অতীতকেই যেন নতুন মহিমায় ফিরিয়ে নিয়ে আসছে। বিলীয়মান একটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটা শুভবার্তা।

হাওয়ার প্রতি দর্শক, সমালোচকদের এমন প্রতিক্রিয়ার অবশ্য কারণ রয়েছে। এর সিনেমাটোগ্রাফি, গল্প বলার ধরণ, রঙের ব্যবহার, নান্দনিক শব্দযোগ সবই মন কেড়েছে দর্শকের। আর দশটা ঢাকাই চলচ্চিত্র থেকেও হাওয়া কিছুটা ভিন্ন। এতে বাণিজ্যিক সিনেমার প্রথাগত রং ঢং, জৌলুস নাচ, আইটেম গান আর নায়ক নায়িকার সংগ্রামী প্রেমের উপাখ্যান নেই। আছে খুব সধারণ খেটে খাওয়া কয়েকজন জেলের সাগরে মাছ ধরার কাহিনি। সিনেমার মূল গল্প এগিয়েছে রহস্যকে মূল চরিত্রে রেখে। বঙ্গোপসগারে একটি নৌকায় মাছ ধরার সময় হঠাৎ করেই ওই জেলেদের জালে উঠে আসে এক তরুণী। জেলেদের নেতা নিষ্ঠুর আর কুটিল চান মাঝি মেয়েটিকে রেখে দেয় তাদের নৌকায়। কিন্তু মেয়েটি আসার পর থেকেই ঘটতে থাকে একের পর এক ঘটনা। বুঝতে পারেনা কে দায়ি তাদের এই অবস্থার জন্য, মাথার উপর বিশাল শূন্য আকাশ, নীচে অথই দরিয়া নাকি নৌকায় থাকা রহস্যঘেরা সেই মেয়েটি? এভাবেই গল্প এগিয়েছে।

পুরো সিনেমায় যে বিষয়টি দর্শককে বিমোহিত করে রাখে তা হল এর অসাধারণ ভিজ্যুয়াল আর ভিজ্যুয়ালের সাথে মিক্স করা নান্দনিক শব্দযোগ। সমুদ্রে নোঙ্গর ফেলার পর নীল জল ভেদ করে বুদ-বুদ সাদা বাবল তুলে নোঙ্গরটি সমুদ্রতলে যখন যাচ্ছিলো ওই সময় বাবলের তালে শব্দের কম্বিনেশন ছিলো দারুণ। সিনেমাটোগ্রাফি দেখে মনে হয়েছে পরিচালক ক্লাসিক আর্টপিসগুলো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এর ফ্রেমিং এবং কম্পোজিশন করেছেন। প্রতিটি চরিত্রে পেশাদার অভিনয়, সাহসী এবং ঝরঝরে সংলাপ, লিডিং ক্যমেরা অ্যাঙ্গেল এবং মুভমেন্ট সবকিছু দর্শককে মুগ্ধ করে রাখে। হাওয়ার এই ভিন্নতা তাই একে নিয়ে গেছে দর্শকের মনের গভীরে।

ফলে দর্শকের ভিন্ন ঢঙের গল্প নির্ভর সিনেমার প্রতি যে আগ্রহ এটা আমাদের চলচ্চিত্রাকারদের বুঝতে হবে। দর্শকদের এই আগ্রহ ধরে রাখতে অনেক খাটতে হবে আমাদের পরিচালকদের। কেবল হালকা বিনোদন দিয়ে দর্শকের আগ্রহ বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। নিয়ে আসতে হবে বৈচিত্র্য এবং বেরিয়ে আসতে হবে কেবল বিনোদন নির্ভরতা থেকে। দায়িত্ব নিয়ে সমসাময়িক বাস্তবতাকে সিনেমায় নিয়ে আসতে হবে, যেমনটা এনেছিলেন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, জহির রায়হান, আলমগীর কবির কিংবা তারেক মাসুদ। এই নির্মাতারা তাদের সিনেমায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টিকে থাকা অন্যায়, অসাম্য আর শোষণমূলক ব্যবস্থার যে ভয়াবহ চিত্র উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন তা দর্শককে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় আজও। বিনোদনমূলক সিনেমা মানুষকে ভাবতে শেখায় না বরং ভাবনা থেকে মানুষকে দূরে রাখে যা একটি সমাজের জন্য কখনই মঙ্গলজনক নয়। জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট গতানুগতিক বাণিজ্যিক সিনেমার বিনোদন দেবার ধারার বিরোধীতা করেছেন। বিনোদনের ধারাকে প্রত্যাখান করে তিনি তাঁর নাটকে নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করেছিলেন যা দর্শককে বিনোদন নেয়া থেকে বিরত রেখে ভাবতে শেখায়। এই কৌশলগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন চলচ্চিত্রাকার তাদের চিন্তাশীল সিনেমায়ও ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে মৃণাল সেন। তিনি তাঁর ‘ইন্টারভিউ’, ‘পদাতিক’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘আকালের সন্ধানে’ সিনেমায় রাজনৈতিক সমালোচনার বিষয়বস্তু রাখার পাশাপাশি নির্মাণশৈলীতেও রেখেছেন ব্রেখটীয় কৌশল যা দর্শককে বিনোদনে বুদ হওয়া থেকে বিরত করে ভাবতে বাধ্য করে।

বর্তমানে সিনেমা নির্মাণে তরুণ পরিচালকদের এগিয়ে আসাটা আমাদের আশাবাদী করে একারনেই যে হয়তো নতুন এই পরিচালকদের দ্বারা একদিন মৃণাল সেনের মত চিন্তাশীল সিনেমা নির্মিত হবে এদেশে, যেখানে তারা দর্শককে মুখোমুখি করিয়ে দেবে সমসাময়িক সমস্যাগুলোর সাথে। সেই সাথে ভাবতে বাধ্য করবে দর্শকদের এবং পরিবর্তনের ডাক দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading