ছাদ বাগান: আধুনিক নগর কৃষির অপার সম্ভাবনা
ড. আনজু-মান-আরা । বুধবার, ২৪ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুত নগরায়নের পাশাপাশি জনসংখ্যা বেড়ে চললেও কমছে গাছপালা, বাড়ছে দারিদ্র্য। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনসহ ব্যাপক নির্মাণ কাজে শহরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবাদি জমির সংকোচন ও গাছপালা কমে যাওয়ার ফলে বহু প্রজাতির পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, গাছপালার ক্রমবিলুপ্তির কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ব্যাপক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য উন্নত করা সম্ভব। কিন্তু শহরাঞ্চলে আবাদি জমি ও গাছপালা কমে যাওয়ায় বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের সুযোগ নেই বললেই চলে। আমাদের নগরকে তাই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। ছাদ ও বাড়ির আঙ্গিনা, খালি জায়গায় ব্যাপক ভিত্তিতে সবজি, ফল ও ফুল বাগান করা হলে বায়ু ও পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব।
ছাদ বাগান এখন দেশের জনপ্রিয় একটি কৃষি পদ্ধতি। মূলত বাড়ির খালি ছাদে অথবা বেলকনিতে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ফুল, ফল, শাক-সবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদবাগান বলে। অতি প্রাচীনকাল থেকে ছাদ বাগানের ইতিহাস দৃষ্টিগোচর হয়। ছাদে বাগানের প্রথম ধারণা এসেছিল আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে। মেসোপটেমিয়ায় সম্রাট নেবুচাঁদনেজার তার স্ত্রীর জন্য ইউফ্রেটিস নদীর তীরে প্রথম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেন। সেই থেকেই ছাদবাগানের প্রথম ধারণা এসেছিল। এখন মানুষ নিজ বাড়ি বা দালানের কার্নিসে, বারান্দায় কিংবা ছাদে বাগান করছেন। যাদের চাষের জন্য অনেক জমি নেই কিন্তু নিজ হাতে কৃষি কাজ করা বা শাক, সবজি ও ফল চাষের শখ রয়েছে অথবা যারা আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য কৃষিকে বেছে নিতে চাচ্ছেন তাদের জন্য ছাদ কৃষি হতে পারে একটি উত্তম পদ্ধতি।
বিশ্বব্যাপী নগরায়ন বাড়ছে ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন হলেও তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে একটি অমিত সম্ভাবনা। ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব না হলেও এটি পারিবারিক নিরাপদ পুষ্টি চাহিদা পূরণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া শহরে বসবাসরত কিশোর ও বৃদ্ধদের হাল্কা পরিশ্রমের মাধ্যমে মনের খোরাক ও সময় কাটানোর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে দিন দিন ছাদ বাগানের গুরুত্ব বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর শৌখিনতার প্রতীক নয় বরং অর্থনৈতিক উৎসের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও নির্মল বায়ু উৎপাদনের জীবন্ত কারখানা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ন্যাপট-২-এর অর্থায়নে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি প্রকল্পের (আইডি-১৫৩) আওতায় ছাদ বাগান নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অবশ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ছাদে যেসব বাগান দেখা যায় তার অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে বাড়ির ছাদে যে কোনো শাক-সবজি ফলানো সম্ভব। টমেটো, বেগুন, মরিচ, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, ব্রোকলি, ঢেঁড়শ, ডাটা, পুঁইশাক, লাল শাক, কলমী শাক, মুলা, শালগম, পুদিনা পাতা, বিলাতি ধনিয়া, মরিচ (সারা বছর), লাউ, করলা, শসা, ঝিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, সীম, বরবটি ইত্যাদি নানা ধরনের মৌসুমী সবজি ছাড়াও কচু, সজনে, লেবু, পেঁপে ইত্যাদি অনায়াসে উৎপাদন করা যায়।
বাংলাদেশে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশে ছাদ বাগানের সূচনা। তাই পরিবেশ রক্ষা ও নগরীর তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ির ছাদ ছাড়াও এপার্টমেন্ট, বারান্দা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসের ছাদে বাগান, গাড়ি রাখার বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুল গাছের সমন্বয়ে তৈরি করতে হবে সবুজ নগরায়ন। এতে করে পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি পারিবারিক পুষ্টি, মানসিক শান্তি ও অর্থনৈতিক আয়ের উৎস হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে ছাদ বাগান।
লেখক: কৃষি গবেষক।
ইউডি/অনিক

