১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট: ইসির ব্যাখা,মত-দ্বিমত
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:০৫
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে নির্বাচন কমিশন। এতে অংশ নেয় ২৮টি দল। এর মধ্যে ৩০০ আসনে ইভিএম চেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দুটি দল শর্তসাপেক্ষে আর ১৪টি দল ইভিএমের পক্ষে মত দিয়েছে। বিরোধিতা করেছে বাকি দলগুলো। এমন অবস্থার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন গত মঙ্গলবার এক সভায় সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বিএনপি তা প্রত্যাখান করেছে। এছাড়াও পক্ষে-বিপক্ষে নানা দল নিজেদের মতামত জানায়। উত্তরদক্ষিণের প্রতিবেদন

‘ডাকাতি ঠেকাতে’ এই সিদ্ধান্ত: ভোটের সময় ডাকাতি যেন না হয় সেজন্য দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। এছাড়া ইভিএমে নির্বাচন হলে কারচুপি ও সহিংসতা কম হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বুধবার (২৪ আগস্ট) সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এসব কথা বলেন তিনি। সিইসি বলেন, ইভিএম নিয়ে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ইভিএমে আস্থা ফেরাতে কারিগরি দলের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের বৈঠকে সব অভিযোগের উত্তর দেওয়া হয়েছে। বুধবার ডা. জাফরুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকে ইভিএমের প্রসঙ্গটি এলে সিইসি হাবিবুল আউয়াল বলেন, কেউ ইভিএম নিয়ে কোনো ত্রুটি দেখাতে পারেনি। সেজন্য পুরোপুরি আস্থাশীয় হয়ে ভোটে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। ব্যালটের সমস্যা ইভিএমে থাকবে না। ইভিএমে ভোট হলে কারচুপি ও সহিংসতা কম হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, শুধু একটি দল নয়, অনেক দলই ইভিএম চেয়েছে। যারা বিরোধিতা করেছে, তাদের মতামত বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সংকট সবসময় ছিলো, আগামী নির্বাচন সংকট যেন না হয় সেজন্য ইভিএম। ইভিএমে ভোট হলে ‘ডাকাত’ ঠেকাতে পারবে কমিশন। ভোটে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত কমিশনের, রাজনৈতিক দলের মতামত এক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা রাখেনি।

১৫০ আসনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংলাপে আমরা ৩০০ আসনেই ইভিএম চেয়েছিলাম। নির্বাচন কমিশন অর্ধেক আসনে সম্মত হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। নারী নেত্রী আইভি রহমানের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বনানীতে তার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা ২০১৮ সালের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বলেছি, আধুনিক যে টেকনোলজি, এটা ব্যবহার করা সংগত। কারচুপির ও জালিয়াতির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। তারপরও কিছু কিছু করে ইভিএম চালু করা হয়েছিল। এবারও আমরা ৩০০ আসনে চেয়েছিলাম।
‘ইভিএমে কোনো ঝামেলা নেই’ উল্লেখ করে সেতুমন্ত্রী বলেন, যারা ইভিএমকে ভয় পায়, আমি জানি না তারা জনগণের ভোট নিরপেক্ষ হোক, কারচুপিমুক্ত হোক-এটা চায় কি-না।

পাঁচটি করে কেন্দ্রে ব্যবহার করার প্রস্তাব জাফরুল্লাহর: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, কমিশন খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে চলছে। সরকারের উচিত হবে কিছুটা গিভ অ্যান্ড টেক করে সুষ্ঠু নির্বাচন করা। এটা করতে হলে আগ বাড়িয়ে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। আজকেও হানিফ (আওয়ামী লীগ নেতা) বলেছেন দেড়শটাতে নয়, ৩শ আসনেই ইভিএম চাই। উনাদের জন্য ভালো হবে চুপ করে থাকা। এখন ইভিএমের কারণে যদি নির্বাচনটাই বন্ধ হয়ে যায়, ইলেকশনটা যদি বয়কট হয়, তাহলে এটা জাতির জন্য খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, সবাইকে নির্বাচনে নেওয়া ইসির মূল দায়িত্ব। ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে। এমন কিছু করবেন না যাতে নির্বাচনই না হয়। এজন্য আমার প্রস্তাব হলো ১৫০টির পরিবরর্তে ৩শ আসনের পাঁচটি করে কেন্দ্রে ব্যবহার করার। জনস্বার্থ বিরোধী কিছু হলে মেরুদø শক্ত রেখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল পদত্যাগ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। বুধবার (২৪ জুলাই) সিইসির সঙ্গে নির্বাচন ভবনে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, না ভোটের কথা প্রবর্তনের কথা বলেছি। না ভোটের ব্যাপারে মত আছে। ইভিএম নিয়ে হটকারিতা করতে না করেছি। বলেছি, আপনাদের ওপর ধীরে ধীরে আস্থা বেড়েছে। সেই সুনামটা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেন। সিইসি বলেছেন, আমরা ভেবে দেখি কি কি করা যায়।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপিসহ অন্য দল যদি ইভিএমের কারণে বয়কট করে দায়টা ইসির ঘাড়ে চাপবে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার যেমন দায়ী হবে, ইসিও তেমন দায়ী হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে উনারা যে শতভাগ একমত হয়েছেন তা না। উনারা সরকারের চাপে আছেন, উনারা ভাবছেন।

ইভিএম বিএনপি’র প্রত্যাখ্যান: বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে আগ্রহী নয় বিএনপি এমন মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহারে সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে কমিশন সরকারের হয়ে কাজ করছে। নির্বাচনে আসন নিয়ে সরকারের সাথে সমঝোতা করেছে। আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির যৌথসভা শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখান করছে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচন হবে না। তার আগে সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নতুন কমিশনের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।
ইভিএম নয় ভোট হবে সম্পূর্ণ ব্যালটে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গুমের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। মানুষ সরকারের হাত থেকে মুক্তি চায়। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা বিএনপির মূল লক্ষ্য। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করা হবে।

কারচুপি করতেই ইভিএম ব্যবহার করতে চাইছে: জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, নির্বাচনের ওপর সাধারণ মানুষের কোন আস্থা নেই। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করছে, কারচুপি করতেই ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ইভিএম-এ ভোট গ্রহণ করতে চাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। গত মঙ্গলবার জাপার বনানী কার্যালয়ে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের পর থেকে বারবার সংবিধান কাটাকাটি করে এক ব্যক্তির শাসন কায়েম করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এখন সকল ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে। কর্তৃত্ববাদী কোন সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে একথা বলা-ই যায়। একই নির্বাচন কমিশন নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারলেও দলীয় সরকারের অধীনে তা সম্ভব হয়নি। কারণ, কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রার্থীদের সাথে অন্য প্রার্থীদের নির্বাচনে হলে কখনোই লেভেল প্লেইং ফিল্ড হয় না।

ক্ষমতা ধরে রাখার নীলনকশা: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নির্বাচনকে প্রচন্ড ঝুঁকির মুখে ফেলবে। অবাধ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনাকে সুদূর পরাহত করবে। এটা গণতন্ত্র, নির্বাচন ও ভোটাধিকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। গত মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি। এর আগে দুপুরে নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠক শেষে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর নীলনকশার অংশ অভিযোগ করে জেএসডি সভাপতির বিবৃতিতে বলা হয়, এটা একেবারেই গণআকাঙ্ক্ষা বিরোধী। বাংলাদেশের একজন ভোটার নাই, যিনি ইভিএমএ ভোট দেওয়ার জন্য অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।
ইউডি/সুস্মিত

