বৈষম্যের পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার

বৈষম্যের পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার

মোহম্মদ কামরুজ্জামান । সোমবার, ২৯ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৫০

শুরু থেকেই মানুষ খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অভাব অনুভব করেছে। এসব পেতে তারা সেই তখন থেকেই নিরন্তর সংগ্রাম করে আসছে। আমাদের দেশ সবেমাত্র উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লিখালেও এখন পর্যন্ত এটা একটা গরিব দেশ হিসেবেই পরিচিত। এখন পর্যন্ত দেশে প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। সেই হিসেবে বর্তমানে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির উপরে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি গণমাধ্যমের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি। করোনা মহামারির কারণে তাদের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। এ সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ

বর্তমান পৃথিবীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃথিবী বলা হয়। বিগত ৫০ বছরে বিজ্ঞান অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানের এ আবিষ্কার পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ ভূপৃষ্ঠকে জয় করতে সক্ষম হয়েছে। সাগর, মহাসাগর ও আকাশ জগতকে তারা করায়ত্ব করেছে। মহাশূন্যে তারা স্টেশন নির্মাণ করেছে। এসব আবিষ্কারে বিশ্ব মোড়লরা ব্যয় করেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে অপচয় ও ক্ষতিকর আবিষ্কার হলো মানব বিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্র। ২০২১ সালে বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রের পেছনে ব্যয় বেড়েছে ২০২০ সালের চেয়ে আট গুণ বেশি। অথচ, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করতে কাজ করছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু এবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস’। কিন্তু শক্তিধর দেশগুলো এ নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলেছে। এ নিষেধাজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে তারা প্রতি বছর আবিষ্কার করে চলেছে মানব বিধ্বংসী নতুন নতুন মারণাস্ত্র। আর এর পেছনে খরচ করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে খরচ করেছে ৪৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। চীন খরচ করেছে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া করেছে ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বৃটেন করেছে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফ্রান্স করেছে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ভারত করেছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান করেছে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। আর এককভাবে উত্তর কোরিয়া করেছে ৬৪২ বিলিয়ন ডলার! সব মিলিয়ে ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের এক বছরে অস্ত্র নির্মাণের ব্যয় ৭১৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ হলো ৭১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান বাংলাদেশের ১২ বছরের বাজেটের সমান। উন্নত দেশগুলোতে অপচয়ের এই যখন চিত্র, ঠিক তখনি এক মুঠো অন্ন আর দু’ ফোটা পানির অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে লাখ লাখ বনি আদম। একটি বড় গোষ্ঠি যখন বিলাসে ব্যস্ত, প্রাচুর্য আর অপচয়ের উৎসবে যখন তারা মত্ত, ঠিক তখন তারই অদূরে শোনা যাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার। ধনাঢ্য পরিবারের একজন শিশুর বিনোদনের জন্য লক্ষ-কোটি টাকাও যেখানে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না, সেখানে পূর্ব আফ্রিকার একদল কঙ্কালসার শরীরের শিশু এক ঢোক পানি আর একটা রুটির জন্য তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকে।

বিশ্ব ক্ষুধাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। বিশ্ব ক্ষুধাসূচক ২০২১ অনুযায়ী, ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। সূচকের স্কোর অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুধার মাত্রা গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। অবশ্য ২০২০ সালের তুলনায় বাংলাদেশে এ সূচকের উন্নতি ঘটেছে। গোটা বিশ্বের ক্ষুধার সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কিছুতেই কমছে না। উল্টো অনাহার ও খাদ্যের হাহাকার বাড়ছে।

আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। কিন্তু গরিবের ঘরে ক্ষুধার তীব্রতার কথা বলছি না। সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পরেও একটি ছেলের বেকার থাকার কথা বলছি না। আমরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে টাকা প্রদানের কথা বলছি। কিন্তু গরিবরা তা কেন পাচ্ছে না, তার কারণ বলছি না; বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা ও মাতৃত্বকালীনভাতা বিলানোর কথা বলছি, কিন্তু স্থানীয় দলীয় নেতাদের চুরি করার কথা বলছি না। মুক্তিযোদ্ধাভাতা ও প্রতিবন্ধীভাতার কথা বলছি, কিন্তু দালাল আর ধান্ধাবাজ নেতারা তা মেরে খাচ্ছে, এ কথা বলতে পারছি না। এটাই হলো আমাদের দেশের রাজনীতির ধারাবাহিক চিত্র।

দেশে কোটিপতির সংখ্যা কয়েকশগুণ বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কয়েক হাজার গুণ। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। সমাজের অধিকাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে এবং নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তে অধোক্রম হচ্ছে। একদিকে কিছু লোক অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে, অন্যদিকে সিংহভাগ লোকের আয় কমে যাচ্ছে। ফলে সমাজে বৈষম্য বেড়ে এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। বৈষম্যের কারণে সমাজে ন্যায়বিচার ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। তাদের বিত্তবৈভবে পিষ্ঠ হচ্ছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত মানুষের কাছে পৃথিবী কাব্যের মতো কোনো স্বপ্নময় আশ্রয় নয়। বরং গদ্যের মতো রসকষহীন ও একঘেঁয়ে। বৈষম্যের পৃথিবীতে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার।

লেখক: কলামিস্ট।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading