স্বাস্থ্যসেবা: সরকারি হাসপাতালে বেহাল কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা
নজরুল ইসলাম সেজান । শুক্রবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১০:৪০
বাংলাদেশ জনসংখ্যাবহুল দেশ। এ ক্ষেত্রে বলা দরকার, দেশের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ কথাও বলা দরকার, দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার অভাব-অনটনকে মোকাবিলা করেই জীবনযাপন করেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না মেলে তবে বিষয়টি উদ্বেগের। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই ভরসা এখন বেসরকারি হাসপাতাল।
সরকারি পর্যায়ে উপজেলা, জেলা বা বিশেষায়িত হাসপাতাল যেখানেই চিকিৎসার জন্য যাওয়া হোক না কেন, ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি হতে ভোগান্তি, ভর্তি হওয়ার পর শয্যা পেতে ভোগান্তি, শয্যা পাওয়ার পর সেবিকা ও চিকিৎসকের দেখা ও সেবা পেতে ভোগান্তি। এরপর বিনামূল্যের ওষুধ পেতে ভোগান্তি, পথ্য পেতে ভোগান্তি, এমনকি শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র পেতেও পোহাতে হয় ভোগান্তি। টাকা না দিলে পাওয়া যায় না স্ট্রেচার, হুইল চেয়ার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সেবা তো দূরের কথা, টাকা ছাড়া কোনো কথাই বলা যায় না। টাকা নিয়েও যে তারা ঠিকমতো চিকিৎসা বা সেবা দিচ্ছে তাও না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। আমরা বলতে চাই, সরকারি হাসপাতালগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং স্বল্প আয়ের মানুষরাও যেন সহজে চিকিৎসা পেতে পারেন সে জন্যও সরকারি হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হয়রানিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় তবে বিষয়টি কতটা পরিতাপের- বলার অপেক্ষা রাখে না।
উল্লেখ্য, আইসিডিডিআর,বির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সাল থেকে দেশে বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অগ্রগতি শুরু হয়। আর এই অগ্রগতিটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভর করে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর। বেসরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের এই নির্ভরশীলতার কারণ হলো, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা সংকট। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়লেও ২০১৯-২০ সালে পরিচালিত এই জরিপের ভিত্তিতে সংস্থাটি বলছে, দেশের শতকরা ১৪ শতাংশ হাসপাতাল কখনই নিবন্ধনের আওতায় আসেনি।
আমরা বলতে চাই, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত যেমন জরুরি, তেমনি সরকারি হাসপাতালের সব ধরনের সংকট দূর করতে হবে। যে কেউ যেন সহজে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে অভিযানও পরিচালনা করেছে এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। যা সামগ্রিকভাবে দেশের চিকিৎসার অগ্রগতির জন্য ইতিবাচক নয়।
এই বিষয়টিও এড়ানো সুযোগ নেই যে, বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় সরকারি হাসাপাতালের তুলনায় বেশি। ফলে অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে না, অন্যদিকে, সরকারি হাসাপাতালেও যদি সেবা না মেলে এবং নানা ধরনের সংকট দূর না হয় তবে তা সাবির্কভাবে দেশের চিকিৎসা খাতের জন্য স্বস্তির নয়। আমরা মনে করি, সার্বিক বিষয় আমলে নেওয়া এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। সংশ্লিষ্টদের এটাও অনুধাবন করা জরুরি, যদি সরকারি হাসাপাতালের কাঙ্ক্ষিত সেবা না মেলে তবে তা উৎকণ্ঠাজনক। এছাড়া চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অনেকে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে এমন আলোচনায়ও উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। চিকিৎসা সেবার মান সংক্রান্তও নানা ধরনের অভিযোগও আছে।
সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ নানা স্বাস্থ্য সংকটে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং সরকারি হাসাপতালে মানুষ ভরসা পাচ্ছে না- এই বিষয়টিকে সহজ করে দেখার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হয়রানিসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ায় সরকারি হাসপাতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন রোগীরা- এই আমলে নিয়ে সংকট দূর করতে কাজ করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। মানুষ যেন সরকারি হাসাপাতালের প্রতি আস্থা রাখতে পারে সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত সেবা প্রদানের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। দেশের চিকিৎসা খাতের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এমনটি কাম্য।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

