মাদকের ভয়াল থাবায় ধ্বংসের পথে আজকের যুবসমাজ
রফিকুল আলম । বুধবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০
মাদক সেবন এবং ব্যবসা আর খুন-অপরাধ করোনাভাইরাস, লকডাউন কিছুই মানছে না। করোনা ঠেকাতে অনেক কিছু যখন কমে গেছে, নিয়ন্ত্রিত; তখনো অবাধে চলছে মাদকের ব্যবসা ও অপরাধকাণ্ড। লকডাউনের মধ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি ও সেবনকারীরা। দেশের অভিজাত এলাকা হয়ে পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে মাদকের ভয়াল থাবা শহর থেকে শুরু করে এখন গ্রামের ঘরে ঘরে। ভয়াল মাদকাসক্তি তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। নষ্ট করে দিচ্ছে স্নেহ-মায়া, ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন। এছাড়াও উঠতি বয়সীরা নেশাগ্রস্ত হয়ে গড়ে তুলছেন পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং। আর ওই গ্যাংয়ের সদস্যরা একে অপরকে খুন করছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। শুধু তাই নয়, মাদকের সর্বশেষ সংযোজন ভয়ঙ্কর এলএসডি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও। তবে করোনার প্রথমদিকে দেশব্যাপী লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, ইসলামী মূল্যবোধ শিক্ষা কমে যাওয়া, সামাজিক নীতিহিনতা, ন্যায়-বিচারহীনতা এবং অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কমে যাওয়ায় এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তার মধ্যে মানবিকবোধ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, অবরুদ্ধ হয়ে যায় বিবেক, যার ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তির দ্বারা যে কোনো ধরনের অপরাধ মুহূর্তের মধ্যেই সংঘটিত হয়ে যায় কোনো অনুশোচনা ছাড়াই। ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে সুবিধাবাদিরা। সময়ে সময়ে সংঘটিত হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ খুনি ও ধর্ষকই মাদকাসক্ত ছিলেন মর্মে প্রমাণিত হয়। দেশব্যাপী মাদকের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে, তরুণ-তরুণীরা মাদকে বেশি আসক্ত হলেও শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষই মরণঘাতী মাদক গ্রহণ করছে। সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগসহ সামাজিকভাবে মাদকের ভয়াবহতা এবং পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করলেও কমছে না মাদকসেবীর সংখ্যা, কমছে না মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা। মাদক ব্যবসায়ীরা অল্প সময়ে অধিক সম্পদের মালিক হওয়ার নেশায় সারা দেশে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদকের ভয়াবহতা ও পরিণতির কথা বুঝতে ও জানতে না পারায় বহু কিশোর-কিশোরী বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা মাদক বিক্রেতাদের ফাঁদে পা দিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো অন্য কোনো মানুষ যদি ব্লেডের আঘাতেও শরীরে কোনো অংশ সামান্য কেটে ফেলে। সেখানে সহমর্মিতা জানাবে, রক্ত দেখে ভয় পাবে, প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসবে; কিন্তু একজন মানুষ যখন মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন খুন জখম, কাটাকাটি, রক্তপাত তার কাছে কিছুই না। বর্তমানে আমাদের দেশে ঘটা একটি খুনের ঘটনার গভীরে গিয়ে জানা যায় খুনি মাদকাসক্ত ছিলেন, ধর্ষক কিংবা উত্ত্যক্তকারী মাদকসেবন করতেন। বাংলাদেশে যত ভয়ংকর অপরাধ ঘটে, তার মধ্যে অধিকাংশই মাদকসেবীর দ্বারা সংঘটিত। রাজনৈতিক দুষ্ট নেতার স্বার্থ হাসিলের কাজেও ব্যবহার হয় মাদসেবীরা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ হাসিলের কাজেও ব্যবহার হয় মাদসেবীরা। শুধু কারও দ্বারা ব্যবহারই নয়, স্বয়ং পরিবারের সদস্যদেরও মারধর কিংবা হত্যাকান্ডের মতো ঘটনাও সংঘটিত হয় মাদকাসক্তদের দ্বারা। অধিকাংশ অপরাধের মূলেই মাদক, মাদকেই সর্বনাশ। দেশ থেকে মাদক নির্মূল ছাড়া অপরাধজনক কর্মকান্ড কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বাবা-মাতা ও পরিবারের সদস্যদের মনে রাখতে হবে অসৎসঙ্গের কারণে এবং পরিবারের অবহেলা কিংবা অধিক আস্কারা পেয়েই মাদক সেবনে আগ্রহী হয় তরুণ-তরুণীরা। সন্তানকে মাদক থেকে দূরে রাখতে বাবা-মাকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা কার সঙ্গে মেলামেশা করছে সেদিকে খেয়াল রাখা বাবা-মাসহ পরিবারের বড় সদস্যদের দায়িত্ব। পরিবারের সদস্যদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সন্তানকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার ব্যবস্থা করতে হবে। দায়িত্ববান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করতে হবে। মাদকাসক্তদের নিরাময় কেন্দ্রে পাঠিয়ে সুস্থ করার চেষ্টার পাশাপাশি প্রয়োজনে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করতে হবে। সবাই মিলে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারলে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন কাজ হবে না।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/কেএস

