ক্ষুন্ন ইডেনের ভাবমূর্তি: গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফেরাতে কর্তৃপক্ষ উদাস

ক্ষুন্ন ইডেনের ভাবমূর্তি: গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফেরাতে কর্তৃপক্ষ উদাস

মাঈশা মেহজাবিন । রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১৮:২৫

ইডেন কলেজ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই কলেজ থেকে পাশ করে অনেক নারী দেশ ও বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন ও করে চলেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কলেজটির সুনাম দিন দিন ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আর এজন্য দায়ী কলেজটির অভ্যন্তরীণ ছাত্রলীগের রাজনীতি। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ এখন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই থেমে থেমে চলছে সংঘর্ষের ঘটনা। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মূল কারণ সিট-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের চাঁদাবাজি। এই বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির কারণে আধিপত্য বিস্তার করতে চায় উভয়পক্ষ। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

এর মধ্যে দুবার ছাত্রলীগের কলেজ কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে, সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মীকে। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিককালে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বৈরিতা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজ ও হল দুই-ই বন্ধ ঘোষণা করেছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাসসহ হলগুলো বন্ধ থাকবে। গত কয়েকদিন ধরে ছাত্রলীগের কলেজ শাখার বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে সিট-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও মেয়েদের অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলন করছে একটি গ্রুপ। সম্প্রতি ভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদেরই শুধু সংগঠন থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কাউকে কেন বহিষ্কার করা হলো না? ওদিকে ইডেন কলেজে যে নৈরাজ্য চলছে, কলেজ কর্তৃপক্ষের সে ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ছাত্রীদের সিট ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইডেন মহিলা কলেজের। প্রায় ৩৫ হাজার ছাত্রীর এই প্রতিষ্ঠানটিতে মাত্র ছয়টি ছাত্রীনিবাস আছে। এই আবাসিক হলগুলোতে তিন হাজার ৩১০টি সিটের বিপরীতে থাকছেন ১০ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। অবৈধভাবে যারা হলে অবস্থান করছেন, তাদের মূল নিয়ন্ত্রক ছাত্রলীগ নেত্রীরা। বৈধ আসনের বাইরে সাত হাজার শিক্ষার্থী অবৈধভাবে হলে অবস্থান করলে এবং গড়ে তাদের থেকে ১২ হাজার করে টাকা নিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের দুটি ছাত্রীহলের অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগ নেত্রীরা।
এই প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার ছাত্রীর বিপরীতে আবাসিক সিট রয়েছে ৭৫০টির মতো। গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সেও (গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) অধিকাংশ সিটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ছাত্রলীগ। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে সিট পাওয়া এখানে অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। এই সুযোগে ছাত্রলীগ নেত্রীরা টাকা নিয়ে ছাত্রীদের হলে তোলেন।

কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টিতে নিস্পৃহই থাকতে দেখা যাচ্ছে। অথচ কলেজ ক্যাম্পাসের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব কলেজ কর্তৃপক্ষেরই। নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে যেহেতু সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন, সম্ভবত সে কারণেই কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। তারা সরকারের মুখপানেই চেয়ে থাকছেন, সরকার কী করে তা দেখার অপেক্ষায়। আমাদের কথা হলো, ইডেন কলেজে যা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব মূলত কলেজ কর্তৃপক্ষের। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে অবশ্যই। একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি আমাদের চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাবে-এটা হতে পারে না।

শুধু ইডেন কলেজ নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নানা ধরনের অপকর্মের কথা প্রায়ই উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে। এক কথায় বললে, সংগঠনটি অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারছে না। এমনকি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। এ অবস্থা থেকে সংগঠনটিকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, তা নিয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। দায়িত্বটা মূলত সরকারেরই, কারণ ছাত্রলীগ সরকারি দলেরই সহযোগী সংগঠন। ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া মানে সরকারেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া। আমরা ইডেন কলেজসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ দেখতে চাই। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের কর্তৃপক্ষ ও সরকার-এই তিন পক্ষকেই নিতে হবে এ দায়িত্ব।

লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading