নিখোঁজ রহস্য ও মরিয়মের কান্না: বেরিয়ে আসুক প্রকৃত সত্য
শামিম আনসারি । রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ১৮:৩৫
বিগত বেশকিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হইচই মরিয়ম মান্নানের মায়ের ‘নিখোঁজ’ হওয়া নিয়ে। মরিয়ম নিজেই দিয়ে আসছিলেন নানা আপডেট। একপর্যায়ে মায়ের মৃত্যুর খবর জানিয়ে তার ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট দেয়া হয়। এবার সেই আইডি থেকেই দেয়া হয়েছে মায়ের বেঁচে থাকার খবর। শুধু তাই নয়, খুলনায় বাড়ি থেকে রহিমা বেগমকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে আগে দাবি করলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে মরিয়ম মান্নান জানিয়েছেন, তার মা আত্মগোপনেই ছিলেন। এমনকি, আদালত ও পুলিশের কাছে রহিমা বেগম অপহৃত হয়েছিলেন বলে নিজে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা প্রত্যাহারে আবেদন করা হবে বলেও জানিয়েছেন মরিয়ম মান্নান।
প্রথমদিকে যারা মরিয়মের মায়ের খোঁজের আন্দোলনে এই মাধ্যমে লাইক, কমেন্টে শেয়ার করে ভার্চুয়ালি সঙ্গে ছিলেন, এখন তাদের অনেকেই মরিয়মের পোস্টে বিরূপ মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, আবেগ ফেরত চাই। এ নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষেপেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেত্রী মরিয়ম মান্নান। সাংবাদিকদের বিষোদগার করে দালাল আখ্যা দিয়ে মায়ের জন্য করা আন্দোলনের জন্য যে চোখের জল পড়েছে তার দাম চেয়েছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে। এরপরই সবার মনে প্রশ্ন জেগেছে কে এই মরিয়ম মান্নান?
বর্তমানে মরিয়ম মান্নান একজন নারীবাদী নেত্রী। তিনি একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ২০১২ সালে তার বাবা আব্দুল মান্নানের মৃত্যু হয়। এ সময় এসএসসি পরীক্ষা দেন তিনি। পাস করার পরে চলে আসেন ঢাকায়। শুরু হয় উশৃঙ্খল জীবন-যাপন। ঢাকা আসার বেশ কিছুদিন পর তিনি বিয়ে করেন এক ডেন্টাল চিকিৎসককে। পরে তাকে ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করেন বরিশাল জেলায়। তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আপনজনরা তেমন কিছুই জানেন না। ঢাকার অভিজাত একটি এলাকায় দুই-তিনটি নারী হোস্টেল খুলে ব্যবসা করছেন। সেখানে অবাধে নারী-পুরুষের যাতায়াত রয়েছে। ফেসবুকে মরিয়মের কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে সূত্রটির দাবির সঙ্গে মিলে যায়। মরিয়ম নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি তেজগাঁও কলেজের ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। চার বছর আগেও কোটা আন্দোলনে পুলিশি হেফাজতে নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে লাইমলাইট পেয়েছিলেন মরিয়ম মান্নান। শারীরিকভাবে তাকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে ভাইরাল হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পোস্ট ছবি ভিডিও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করে।
রহিমা বেগম যখন নিখোঁজ হন তখন গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব জায়গায় তার ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে সক্রিয় উপস্থিতি ছিল মরিয়মের। তার কান্নার মধ্যে ছিল রহস্য, কথার ভেতর লুকোচুরি। কখনোই তিনি গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য দেননি। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তার রূঢ় আচরণের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধেও এ তরুণী নানা অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু তার মা মা রহিমা বেহমকে জীবিত উদ্ধারের পর থেকেই দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। পাল্টে যায় মরিয়ম মান্নানের উচ্চবাচ্য।
খুলনায় বাড়ি থেকে রহিমা বেগমকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে আগে দাবি করলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে মরিয়ম মান্নান বলেন, তার মা আত্মগোপনেই ছিলেন। আদালত ও পুলিশের কাছে রহিমা বেগম অপহৃত হয়েছিলেন বলে নিজে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা প্রত্যাহারে আবেদন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। মরিয়ম মান্নানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সমালোচনা হচ্ছে যে পুরো ঘটনাটা সাজানো, আপনার মা আত্মগোপনে ছিলেন, আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল—এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী? জবাবে এই তরুণী বলেন, আমরা কিছুই সাজাইনি। মায়ের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। যারা বলছেন, তারা প্রমাণ করুন যে মা আত্মগোপনে ছিলেন। যে বাড়ি থেকে মাকে উদ্ধার করা হয়েছে, তারও ১৭ দিন আগে মা কোথায় ছিলেন, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি। মায়ের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি, তাতে বুঝতে পারছি তিনি অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। যে বাড়িতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা আমাদের পরিচিত। তারা তবে কেন আমাদের সঙ্গে মায়ের কথা জানিয়ে যোগাযোগ করলেন না?
এদিকে খুলনার নিখোঁজ রহিমা বেগমকে পুলিশ ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে নাটকীয়ভাবে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের পর স্বস্তি ফিরে এসেছে রহিমা বেগমের মেয়ের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হওয়া ৬ জনের পরিবারের মধ্যে। ভুক্তভোগীদের দাবি, রহিমা বেগমের আত্মগোপনের ঘটনাটি পুরোটাই নাটক। তাদের হেনস্থার জন্যই রহিমা বেগম স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছিলেন। রহিমা বেগমের এই অন্তর্ধানের পেছনে তার সন্তানদেরও ইন্ধন রয়েছে। এখন আসল সত্য প্রকাশ পেয়ে ঘটনার মূলহোতার মুখোশ উন্মোচন হবে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

