ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপকতা আমাদের দুঃখী ও বিমর্ষ করে বৈকি

ঘুষ বাণিজ্যের ব্যাপকতা আমাদের দুঃখী ও বিমর্ষ করে বৈকি

আরেফিন জামান মুন্না । রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ০৯:৩০

ঘুষ দেয়া বা নেয়া বর্তমান সমাজে যেন এক অনিবার্য পরিণতির নাম। ঘুষহীনতা মানেই স্থবিরতা। সেবা বা কাজ না পাওয়ার আশঙ্কা। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজের (সিআইপিই) যৌথ জরিপে উঠে এসেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) ট্রেড লাইসেন্স তৈরি ও নবায়নের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে ঘুস দিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করেছে দেশ। এ পর্যায়ে এসে সরকারের ট্রেড লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুস বাণিজ্যের ব্যাপকতা আমাদের দুঃখী ও বিমর্ষ করে বৈকি! উদ্বেগজনক হলো, কেবল ট্রেড লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষই নয়, দেশের অপরাপর সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বেশিরভাগই অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

হয়রানি-দুর্নীতি ও ঘুসমুক্ত সেবাপ্রাপ্তি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হলেও বাস্তবতা হলো, দেশে বর্তমানে ঘুস ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া যেন অলৌকিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্যজনক হলো, আমাদের সেবা খাতে যেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, সেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লিতে কেজরিওয়াল সরকার চালু করেছে সরকারি সেবার হোম ডেলিভারি সার্ভিস প্রকল্প। একটি নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করলে সহায়তার জন্য অকুস্থলে পৌঁছে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। যেমন-যদি কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয়, তাহলে নির্ধারিত কল সেন্টারে ফোন করে নিজের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও ঠিকানা জানাতে হবে। এরপর এজেন্সি থেকে একজন ‘মোবাইল সহায়ক’ নিয়োগ দেওয়া হবে। তিনি সরাসরি আবেদনকারীর বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন। অবশ্য আবেদনকারীকে ড্রাইভিং পরীক্ষার জন্য একদিন মোটর লাইসেন্সিং অফিসে যেতে হবে। পরীক্ষায় পাস করলে বাড়িতেই সরকার নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে পৌঁছে দেওয়া হবে ড্রাইভিং লাইসেন্স। একইভাবে পাসপোর্ট, আয়কর সনদ, রেশনকার্ডসহ ৪০টি সরকারি সেবা ঘরের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি সরকার।

কি সরকারি কি বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই ঘুষ জীবন্ত সত্তা। উন্নয়নের যজ্ঞের বৃহৎ ক্যানভাসের পেছনে রয়েছে ঘুষকেন্দ্রিক নেক্সাস। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও যারা নানাভাবে লাভ তুলে নেন তারা হলো রেন্ট সিকার। ঘুষ একক ব্যাপার নয়, এর রয়েছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎদলীয় তৎপরতা। ঘুষ অনেক পক্ষের পারস্পরিক সমঝোতামূলক অপতৎপরতা। ঘুষের পরিমাণ সহনশীল মাত্রায় থাকলে তা সংবাদ হতো না বা পাঠক আহত হতেন না। বিভিন্ন ধরনের কাজ ও সেবা পেতে ঘুষের পরিমাণ নিয়ে মোটামুটি একটা স্ট্যান্ডার্ড দাঁড়িয়ে গেছে। সেবা গ্রহীতা ঘুষ প্রদানে এক সহনশীল অভ্যাসের আওতায় চলে এসেছেন। কারণ তারা বুঝে গেছেন কাজ উদ্ধারে এছাড়া আর ‘উন্নত’ কোনো বিকল্প নেই।

যাদের ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়, তারা ঘুষের পরিমাণ পূর্বানুমান করতে পারেন, ঘুষ বরাদ্দ রাখেন। কোনো কারণে কর্তৃপক্ষ ঘুষ না নিতে চাইলে বা কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশানুসারে ঘুষ দিতে না পারলে তাদের মন খারাপ হয়। ঘুষ দিতে পারাটা অনেকের কাছে আনন্দ ও বিশেষ দক্ষতার বিষয়। যারা ঘুষ দেন তারাও একে বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসরণ করে তা কয়েকগুণ সুদে আসলে তা তুলে নেন। ঘুষের চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় জনগণকে। কারণ, সরকারি টাকার মালিক জনগণ।

প্রশ্ন হলো, দিল্লিতে যখন সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এমন নাগরিকবান্ধব প্রকল্প চালু হয়েছে, তখন আমাদের অবস্থাটা কী? টিআইবির জরিপ বলছে-দুর্নীতিতে দেশের শীর্ষ খাতগুলোর মধ্যে অন্তত সাতটিই সেবা খাতের। বলার অপেক্ষা রাখে না, ট্রেড লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের লাগামহীন ঘুস বাণিজ্য ও দুর্নীতি সেবাগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করছে এবং এর ফলে তারা ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে ঘুস বাণিজ্যে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষ যাতে প্রয়োজনের সময় হয়রানি ও ভোগান্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে ট্রেড লাইসেন্স পেতে পারেন, এ লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক।

ইউডি/সিফাত/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading