বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক: সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন আবশ্যক

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক: সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন আবশ্যক

সাইফুল্লাহ আমান । বুধবার, ২৬ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ২১:৪৫

ঢাকার অদূরে গাজীপুরের নামকরা একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন দেবব্রত শর্মা (ছদ্মনাম) নামে এক ইন্ডিয়ান নাগরিক। পোশাক কারখানার মানবসম্পদ মহাব্যবস্থাপক (এইচআর) হিসেবে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। করোনার কারণে অনেক কর্মকর্তার চাকরি চলে গেলেও তার চাকরি যায়নি। তার প্রাপ্ত বেতন-ভাতাও খুবই উচ্চমানের। অফিসিয়াল হিসাবে তার বেতন সাড়ে ৩ লাখ টাকারও বেশি। কাগজ-কলমের বাইরে আরও ভাতা পেয়ে থাকেন বলে জানান একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আরও চারজন ইন্ডিয়ান কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এরা সবাই খুবই উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন, পাশাপাশি পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের আরও নানা সুযোগ-সুবিধা।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার সাভার, আশুলিয়া জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন অসংখ্য কোম্পানিতে কাজ করছেন ইন্ডিয়ান, শ্রীলঙ্কান, পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। এরা সবাই বাংলাদেশিদের চেয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি বেতনে কাজ করছেন। এসব বেতন-ভাতার প্রায় সবটাই বিদেশে চলে যাচ্ছে বলে জানা যায়। বিদেশি কর্মীদের থাকা-খাওয়া খরচও কোম্পানি বহন করে। ছুটিতে নিজের দেশে গেলে সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসে তারা। এতে করে, দেশের আয় চলে যাচ্ছে বিদেশে এবং পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে দেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে। আমাদের দেশে দক্ষ লোক না থাকার কারণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছে বিদেশিরা। যাদের মাধ্যমেও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের সঠিক সংখ্যা নেই সরকারের কাছেও। টিআইবির তথ্যমতে, আড়াই থেকে ৩ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে কর্মরত। এদের মধ্যে মাত্র ৯০ হাজার বৈধ। বাকিরা অবৈধ উপায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে এ সংখ্যা ৮৬ হাজার, যাদের বেশিরভাগ ইন্ডিয়ান।

দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে আয়কর আদায় বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচার রোধের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী, তা বলাই বাহুল্য। জানা যায়, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে যৌথভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটিকে (বিডা) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। উদ্বেগজনক হলো, এ মুহূর্তে দেশে কতজন বিদেশি নাগরিক বৈধ বা অবৈধভাবে কাজ করছেন, এর প্রকৃত পরিসংখ্যান সরকারি ও বেসরকারি কোনো পর্যায়েই সুনির্দিষ্টভাবে নেই। তবে টিআইবির এক গবেষণা অনুযায়ী, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, তৈরি পোশাকশিল্প, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নামিদামি হোটেল ও রেস্তোরাঁর মতো খাতে কাজ করছেন অন্তত আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক, যারা প্রতিবছর অবৈধভাবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছেন। উপরন্তু অনেকে কর ফাঁকি দিচ্ছেন; আবার অনেকে অবৈধভাবে এদেশে কাজ করে কোনো কর না দিয়েই টাকা নিয়ে যাচ্ছেন, যে কারণে প্রতিবছর সরকার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। বিষয়টি কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ ও চাকরি করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব যেমন রয়েছে; তেমনি তা বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশিরা তাদের প্রকৃত বেতন গোপন করার সুযোগ পাচ্ছে। নিয়োগ কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত বেতনের একটি অংশ বৈধভাবে দিলেও আয়কর ফাঁকি দিতে এর সিংহভাগই অবৈধভাবে নগদে দিয়ে থাকেন। অবৈধভাবে কর্মরত কর্মীদের হাতখরচ, আবাসন, পরিবহণ ও অন্যান্য সুবিধাসহ পুরো বেতনই নাকি নগদ অথবা অন্য কোনো দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়ে থাকে। এটি আমাদের প্রচলিত আইন ও নীতি পরিপন্থিই নয়; একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা। আয়কর প্রদান নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীনকাল থেকেই দেশে দেশে বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স প্রদানের বাধ্যবাধকতা চালু রয়েছে। মূলত কর হিসাবে প্রদানকৃত অর্থ একটি দেশের উন্নয়নে ব্যয় হয়। তবে এদেশে কর্মরত বিদেশিরা প্রচলিত আইনের ও নিয়মকানুনের বাইরে নন-এ কথা যেমন সত্য, তেমনি কর আদায়ের নামে তারা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটি দেখাও জরুরি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে প্রাপ্য কর আদায়ের পাশাপাশি তাদের মাধ্যমে যাতে টাকা পাচার হতে না পারে, এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া হবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ইউডি/সিফাত/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading