পরিত্যক্ত কূপেও গ্যাসের সন্ধান: অনুসন্ধানে মিলতে পারে সুফল

পরিত্যক্ত কূপেও গ্যাসের সন্ধান: অনুসন্ধানে মিলতে পারে সুফল

জাকারিয়া পারভিন। রবিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৬:৫৮

মাটির নিচে খনিতে পাওয়া এই গ্যাস বর্তমান সভ্যতার প্রধান চালিকা শক্তি। পরিবারের ছোট্ট পরিসর থেকে শুরু করে, যানবাহন এবং কলকারখানার বৃহৎ পরিসর- সর্বত্রই আজ গ্যাসের ব্যবহার বিদ্যমান। গ্যাসের সহজ লভ্যতা একটি দেশের শিল্পায়নকে যেমন ত্বরান্বিত করে, ঠিক তেমনি গ্যাসের স্বল্পতা একটি দেশের শিল্পায়নের বিকাশকে মন্থর করে। তাই দেশের অর্থনীতির বিকাশ এবং গ্যাসের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠা এই অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে দেশে গ্যাসের সহজ লভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তার জন্য গ্যাসের অনুসন্ধান ও গ্যাসের উত্তোলন বাড়াতে হবে।

পোশাক শিল্প, ডাইয়িং, ফিনিশিং, টেক্সটাইল মিল, স্পিনিং মিল, টাইলস ও সিরামিক মিল, রাইস মিল, কেমিক্যাল মিল, স্টিল মিল, ওয়েল রিফাইনারি, খাদ্য প্রস্তুতকারি বেকারিসহ প্রায় সকল ধরনের মিল কারখানায় গ্যাসের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবহার বিদ্যমান। এসব মিল কারখানায় বেশ কিছু ইক্যুইপমেন্ট রয়েছে, যেগুলো সরাসরি গ্যাস দ্বারা চালিত। ফলে গ্যাসের অভাবে এই সব মেশিনে উৎপাদন বন্ধ থাকলে পুরো কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যেমন পোশাক শিল্প এবং ডাইয়িং, ফিনিশিং, টেক্সটাইল মিলে প্রয়োজনীয় স্টিম উৎপাদনের জন্য বয়লার চালাতে হয়। আর বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ বয়লারই কিন্তু গ্যাস ভিত্তিক। সুতরাং গ্যাসের অভাবে স্টিম উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিংগুলো প্রত্যক্ষভাবেই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এসব স্পিনিং মিল সাধারণত ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকে এবং এসব মিল চালাতে কয়েক মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আর বিদ্যুৎ গ্যাস জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানাতেই উৎপাদিত হয়, যাকে আমরা ক্যাপটিভ পাওয়ার বলি।

আমাদের দেশে স্পিনিং মিলের সংখ্যা চারশ’রও বেশি এবং এসব স্পিনিং মিলের প্রায় সবগুলিই ক্যাপটিভ পাওয়ারের সাহায্য চলে। গ্যাস সংকটের কারণে এসব স্পিনিং মিলগুলো সমস্যায় পড়েছে। গ্যাসের প্রেসার কম হলেও জেনারেটর চালানো যায় না, আবার গ্যাস না থাকলে তো কথাই নেই। ফলে জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না এবং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। আর সুতা যেহেতু রপ্তানিযোগ্য পোশাকের প্রধান কাঁচামাল, তাই স্পিনিং মিলের সমস্যায় পুরো পোশাক খাতই সমস্যায় পড়ে। ফলে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। টাইলস ও সিরামিক মিল এবং বেকারি ফ্যাক্টরিতে ওভেনসমূহ গ্যাসেই চলে। এভাবে গ্যাস সংকটে প্রায় সব ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানই সমস্যায় পড়বে এবং সবক্ষেত্রেই উৎপাদন ব্যাহত হবে।

গ্যাসের সন্ধান: অনুসন্ধানে মিলতে পারে সুফল

সম্প্রতি সিলেটের বিয়ানীবাজারে একটি পরিত্যক্ত ক‚পে নতুন করে গ্যাস পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এ সময়ে এটা আশাব্যঞ্জক ঘটনা অবশ্যই। জানা গেছে, বিয়ানীবাজার গ্যাসফিল্ডের ১ নম্বর ক‚প থেকে ১৯৯৯ সালে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। ২০১৪ সালে কূপটি বন্ধ হয়ে যায়। কিছু রক্ষণাবেক্ষণের পর ২০১৭ সালে আরও সাত মাস গ্যাস উত্তোলন করা হয়। এরপর ক‚পটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০২০ সালে এ কূপসহ তিনটি ক‚পে ওয়ার্ক ওভার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর ১ নম্বর কূপটির ওয়ার্ক ওভার কাজ শুরু হয়। অবশেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এ কূপ থেকে প্রতিদিন ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে পরিত্যক্ত বা পুরোনো অন্যান্য কূপেও গ্যাসের জোর অনুসন্ধান চালানো উচিত বলে মনে করি আমরা। উল্লেখ্য, নতুন কূপ খনন করে গ্যাস উত্তোলনের তুলনায় পুরোনো কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনে সময় ও ব্যয় উভয়ই কম লাগে।

গ্যাস সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সর্বত্র। দেশে উৎপাদিত গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এছাড়া সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি (আবাসিক), সিএনজি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এ কারণে গ্যাস খাতকে দেওয়া উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব। দেশে দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে ত্রিমাত্রিক সার্ভে সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কূপখনন করা হলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় সময়মতো কম্প্রেসার বসানোর ফলে তারা উৎপাদন যথাযথ মাত্রায় ধরে রাখতে পেরেছে। তাই দেশীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারকে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রে থেকে গ্যাস উত্তোলনে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে এবং এখাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি প্রকৌশলী এবং ঠিকাদার নিয়োগ দিতে হবে। আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সফল বাস্তবায়ন করে দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হলে এর কোনই বিকল্প নেই।

লেখক: সমাজ গবেষক

ইউডি/আতা/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading