ব্যাহত টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন: সংকট সমাধানে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
সিয়াম আরেফিন । রবিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২২। আপডেট ২০:৩০
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমছে। রপ্তানির ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কর্মসংস্থান নিয়ে। এমন অবস্থায় ধুঁকছে দেশের শিল্পখাত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রয়োজনে দাম বাড়িয়ে হলেও যেন তাদের কারখানায় গ্যাসের ব্যবস্থা করা হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এটি অব্যাহত থাকলে সামনে এই খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে। রপ্তানি কমে যাবে। এতে রিজার্ভে আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
গত জুলাই মাস থেকে কলকারখানায় ব্যাপক আকারে গ্যাসের সমস্যা হচ্ছে। জুলাইয়ের পর থেকে পিএসআই জিরো ছিল। যার কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে বয়লার এবং স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিং সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নন স্টপ লোডশেডিং চলছেই। বিদ্যুতের সমস্যার কারণে ডিজেল বাবদ অতিরিক্ত ১ কোটি টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এভাবে তো বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না।
করোনা, কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখিতা, মূল্যস্ফীতি, মদ্রার অবমূল্যায়ন, পণ্য জাহাজীকরণের ব্যয়বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও এর উত্তাপ টের পাচ্ছে বেশ ভালো করেই। নানামুখী চাপের কারণে এরই মধ্যে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান।
দেশে শিল্পের কোনো কাঁচামাল উৎপাদন হয় না। একমাত্র কাঁচামাল আছে গ্যাস। গ্যাসের ওপর নির্ভর করেই শিল্প গড়ে উঠেছে। এখন গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল খাত নাজুক অবস্থায় আছে। গাজীপুর ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে ৬০ শতাংশ বস্ত্রকল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত সংকট সমাধান করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ করা না হলে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। চাকরি হারাবেন শ্রমিকরা। ব্যাংকও তাদের পুঁজি হারাবে। গ্যাস সংকটে দেশের টেক্সটাইল শিল্প খাতের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, কোথাও কোথাও দিনে ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না। আবার গ্যাস থাকলেও চাপ থাকছে না।
এ কারণে ৬০ শতাংশ টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এমনিতেই করোনার কারণে দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা থাকলেও তা পূরণ হচ্ছে না। বর্তমানে সুতার উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে পড়ায় তাদের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি জানান, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, আশুলিয়া, ভালুকা, গাজীপুর, সাভার এলাকায় গ্যাসের অবস্থা খুব নাজুক। কোনো কোনো এলাকায় দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকছে না। কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল অক্টোবরে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি হবে, নভেম্বরে আরও উন্নতি হবে; ডিসেম্বরে সংকট থাকবে না। কিন্তু এখন অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। বস্তুত টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা চতুর্মুখী সংকটে রয়েছেন। একদিকে অর্ডার সংকট। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের চাপ। গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে। দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কারখানা চালু রাখা সম্ভব না হলেও শ্রমিকদের নিয়মিত বেতনভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব কারণে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের টেক্সটাইল খাতের লক্ষ্য পূরণ হবে কী করে?
অভিযোগ রয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত থাকলেও তা উত্তোলনে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর উদ্যোগ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর দাম শিগগিরই কমবে বলে মনে হচ্ছে না। বস্তুত সব ধরনের জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার সব সময় অস্থির থাকে। এ কারণে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের শিল্প খাতকে বাঁচাতে হলে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদের সুষ্ঠু ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় রোধ করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক
ইউডি/আতা/সুপ্ত

