ভোজ্যতেল ও চিনির মূল্যবৃদ্ধি: অসৎ ব্যবসায়ীদের হীনমানসিকতা দায়ী

ভোজ্যতেল ও চিনির মূল্যবৃদ্ধি: অসৎ ব্যবসায়ীদের হীনমানসিকতা দায়ী
oil_sugar_price_ud

শামিম আনসারি । রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:২৫

বাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির সংকট চলছে। এমন পরিস্থিতিতে একসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দুটির দাম বাড়ল। বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বেড়েছে। আর প্যাকেটজাত প্রতি কেজি চিনির দাম ১৩ টাকা বেড়েছে। নতুন এই দাম বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত বুধবার সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। একইভাবে গতকালই চিনির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। অবশ্য সরকারের ঘোষণা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কারণ আগে থেকেই বাজারে এ দুটি পণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকারি ঘোষণার পর অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য দুটির দাম আরও এক দফা বাড়িয়ে দিতে পারেন।

অতীত অভিজ্ঞতার উপর নজর দিলে আমরা বলতে পারি যে, ঘোষিত দর কখনোই বাজারে প্রতিফলিত হয় না, বরং বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে বেশি দামে পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। দুঃখজনক হলো, এসব তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ক্রেতাদের জিম্মি করে অধিক মুনাফা লুটে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে। প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো পণ্য বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের দুর্ভোগ উত্তরোত্তর বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত ১১টি নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন সেবার মূল্য এক বছরের ব্যবধানে সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে চাল, ডিম, মাংস, সবজি, ভোজ্যতেল, বিবিধ খাদ্যপণ্য, কোমল পানীয়, কাপড়, জুতা, জ্বালানি ও বাসাভাড়া। এছাড়া গৃহসামগ্রী, গণপরিবহণ, বিনোদন ও শিক্ষা এবং বিবিধ পণ্য ও সেবাও রয়েছে এ তালিকায়।

এখানে অবশ্যই বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব পণ্য ও সেবার দাম বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে গেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মানুষের আয় মোটেই বাড়েনি। এ প্রেক্ষাপটে জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করে জীবিকা নির্বাহ করছে দেশের সিংহভাগ মানুষ। তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমজীবীরা অসহায়বোধ করছেন; অথচ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন উচ্চবাচ্য হয় না বললেই চলে। বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত কোনো ভূমিকা নেই-এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

আমরা বলতে চাই যে, সাধারণত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে কথাবার্তা উঠলে পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পরস্পরের ওপর দোষারোপ করে থাকেন। এভাবে একপক্ষ অপরপক্ষকে দোষারোপ করলেও এটি যে মূলত ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকের অভিযোগ-দেশের ব্যবসায়ীরা পকেট স্ফীত করার বাইরে অন্য কিছু ভাবেন না; জনস্বার্থকে মোটেই গুরুত্ব দেন না। ব্যবসায়ীদের এহেন আচরণ ও কর্মকাণ্ড অযৌক্তিক; অমানবিকও বটে। এ অবস্থায় লোকঠকানো মানসিকতা পরিহার করে তেল, চিনিসহ সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী সমাজ আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এটাই প্রত্যাশা।

চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার দীর্ঘদিন থেকেই অস্থির। এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে গত বছর থেকেই। স¤প্রতি সেই অস্থিরতা আরও বেড়েছে। খুচরা বাজারে চিনি নেই, চিনি নেই পাইকারি বাজারেও। রাজধানীর খুচরা দোকানগুলোতে কখনো চিনি পাওয়া যাচ্ছে, কখনো পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি দোকান থেকে মাঝেমধ্যে তারা চিনি পান। তবে তা পরিমাণে অল্প। সেই চিনি দ্র¤œতই বিক্রি হয়ে যায়। ফলে বেশির ভাগ সময় দোকানে চিনি থাকে না। শুধু সংকটই নয়, বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ইচ্ছামতো দামে। কোনো দোকানে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দিয়েছে সয়াবিন তেলের সংকটও। এই সংকটের মধ্যেই দাম বাড়ানো হলো। শুধু তেল চিনি নয়, চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও শাকসবজি সবকিছুর দামই চড়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গরিব মানুষ এখন মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি অনুভব করছেন। কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আর খাবারের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে দেশের গরিব মানুষ। তাদের জীবিকার সংকট দেখা যায়। সরকার ভর্তুকি কমাতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সুযোগ নিয়েছেন এ দেশের অসৎ ও অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। এ দেশে যে পণ্যের দাম একবার বাড়ে, তা আর কখনোই আগের দামে ফিরে যায় না। আসলে পণ্যের সরবরাহ বা সংকটের সঙ্গে দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা হচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীদের হীনমানসিকতা। সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগই কেবল পারে দেশে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।

লেখক: কলামিস্ট

ইউডি/আতা/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading